—ছবি সংগৃহিত
ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ এখন দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত মাসে তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ইতিমধ্যে দেশটির ৩১টি প্রদেশের সবকটিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রিয়ালের রেকর্ড দরপতন এবং দীর্ঘদিনের কঠোর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন রাজপথে আছড়ে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল মুদ্রার পতন নয়, বরং শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জনগণের ‘আস্থার পতন’।
রিয়ালের দরপতন ও বিক্ষোভের সূত্রপাত
গত মাসে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের চরম অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। দ্রুতই এই আন্দোলনে যোগ দেয় তরুণ প্রজন্ম, যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে এবং যারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। ২০২২ সালে মাসা আমিনি হত্যাকাণ্ডের পর হওয়া বিক্ষোভের তুলনায় এবার নারী ও কিশোরীদের উপস্থিতি কিছুটা কম হলেও, এবারের বিক্ষোভের মূলে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক হতাশা ও মুক্তভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।
প্রাণহানি ও দমন-পীড়ন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্যমতে, এবারের অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের মতো কঠোর পথ বেছে নিয়েছে।
‘গাজা নয়, লেবানন নয়—জীবন হোক ইরানের জন্য’
বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে এখন পরিবর্তনের সুর। তারা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘গাজা নয়, লেবানন নয়, আমার জীবন ইরানের জন্য’। অর্থাৎ, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধান না করে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি) তেহরানের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তার ঘোর বিরোধী সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের ক্ষমতাচ্যুতি এবং মিত্রদের ওপর ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে।
সর্বোচ্চ নেতার সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এখন তাঁর দীর্ঘ শাসনকালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে তিনি বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় ‘প্রস্তুত’ আছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিক্ষোভকে ইরানি জনগণের জন্য ‘সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন।
তরুণ প্রজন্মের ভাষ্য
২৫ বছর বয়সী মিনা রয়টার্সকে বলেন, “আমি শুধু একটি স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চাই। অথচ শাসকরা পারমাণবিক কর্মসূচি আর বিদেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে ব্যস্ত।” বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, বছরের পর বছর দমন-পীড়ন আর নামমাত্র ছাড় দেওয়ার কৌশল এবার আর কাজ নাও করতে পারে। পরিবর্তন এখন ‘অনিবার্য’ বলে মনে হচ্ছে।
ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব ও যুবসমাজের প্রত্যাশার মধ্যকার এই বিশাল ব্যবধান এখন দেশটিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইসলামি বিপ্লবের পাঁচ দশক পর ইরান কি নতুন কোনো বিপ্লবের পথে? এই প্রশ্নই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।