—ছবি সংগৃহিত
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) তাদের নতুন পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ উন্মুক্ত করেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর (রোববার) এনসিটিবির ওয়েবসাইটে এই ডিজিটাল সংস্করণগুলো আপলোড করা হয়।
এবারের বইগুলোতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণায় বড় পরিবর্তন
এবারের পাঠ্যবইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায়। ষষ্ঠ শ্রেণির 'বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়' বইয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরের দিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বিগত দেড় দশকের পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতার ঘোষণার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের একক ভূমিকার কথা উল্লেখ থাকলেও, এবার মেজর জিয়ার নাম ও ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নেতৃত্বের ইতিহাস ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা
সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ পটভূমি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবদান পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। ন
তুন বইগুলোতে:
আওয়ামী লীগের ভূমিকা: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হলেও নতুন পাঠ্যবইয়ের অনেক জায়গায় দলটির নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি অথবা এর ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে।
যৌথ নেতৃত্ব: মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো জাতীয় নেতাদের অবদানকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর অবস্থান: সপ্তম শ্রেণির বইয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের বর্ণনায় আওয়ামী লীগের উল্লেখ এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকলেও, আগের কারিকুলামের মতো তাঁকে 'একক নায়ক' হিসেবে চিত্রায়িত করার প্রবণতা থেকে সরে আসা হয়েছে।
অন্তর্ভুক্ত হয়েছে 'জুলাই অভ্যুত্থান'
২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ের অন্যতম চমক হলো ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ভেতরের পাতায় এই বিপ্লবের সাহসিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ে আন্দোলনের গ্রাফিতি এবং দেয়ালচিত্র স্থান পেয়েছে।
শহীদ আবু সাঈদ এবং মুগ্ধসহ আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের গল্প ও ছবি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অনলাইন সংস্করণ ও বিতরণ পরিকল্পনা
এনসিটিবি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধানরঞ্জন রায় পোদ্দার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংস্করণ উন্মুক্ত করেন।
উপদেষ্টাদ্বয় জানান, ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের হাতে ছাপা বই পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হবে। তবে কারিগরি ও মুদ্রণ জটিলতার কারণে মাধ্যমিক স্তরের সকল বই পৌঁছাতে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সে পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এনসিটিবির ওয়েবসাইট থেকে অনলাইন সংস্করণ ব্যবহার করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবক প্রতিক্রিয়া
ইতিহাসের এই বাঁকবদল নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ একে 'ইতিহাসের সত্য পুনরুদ্ধার' হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ একে 'নতুন রাজনৈতিক প্রভাব' বলে চিহ্নিত করছেন। অভিভাবকরা বলছেন, রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তবে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।