—ছবি সংগৃহিত
‘আজ থেকে আমাদের জন্য শুরু হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়’—হিমাঙ্কের নিচে ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা আর কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার নিউইয়র্কবাসীর সামনে দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিলেন জোহরান মামদানি।
১ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ম্যানহাটানের সিটি হলের সামনে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে নিউইয়র্কের ১১১তম মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন ৩৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। তিনি শহরটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম এবং পবিত্র গ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নেওয়া প্রথম মেয়র।
উত্তাল জনসমুদ্র ও বার্নি স্যান্ডার্সের শপথ পাঠ
অভিষেক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে লোয়ার ম্যানহাটানে জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়। মারি স্ট্রিট থেকে লিবার্টি স্ট্রিট পর্যন্ত সাতটি ব্লকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সমবেত হন, যা নিউইয়র্কের ইতিহাসে এক বিরল দৃশ্য। ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী’ পরিচয়ে নির্বাচিত এই মেয়রকে শপথ পাঠ করান মার্কিন সিনেটর ও প্রগতিশীল রাজনীতির আইকন বার্নি স্যান্ডার্স। এসময় মামদানির পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী রমা দুওয়াজি।
স্যান্ডার্স তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আমরা এমন এক সময়ে জোহরানকে পেয়েছি যখন ঘৃণা ও বিভাজন চরম পর্যায়ে। নিউইয়র্কবাসী আজ বিশ্বকে নতুন এক আশার আলো দেখাল।”
প্রথম দিনেই বড় ধামাকা: ইসরায়েল সংক্রান্ত আদেশ বাতিল
দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজের সাহসিকতার পরিচয় দেন মামদানি। সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা বেশ কিছু বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো— ইসরায়েল বর্জন বা দেশটিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞাটি তিনি তুলে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, তাঁর প্রশাসন হবে স্বাধীন ও জনমুখী।
‘বড় স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়’
উদ্বোধনী ভাষণে মামদানি বলেন, তাঁকে নাকি পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যেন নিউইয়র্কবাসীর প্রত্যাশা কমিয়ে দেওয়া হয়। এর জবাবে তিনি গর্জে উঠে বলেন, “আমি প্রত্যাশা কমাব না। আমাদের প্রশাসন হবে সাহসী। আমরা সব সময় সফল না-ও হতে পারি, কিন্তু আমাদের সাহসের অভাব ছিল— এ কথা কেউ বলতে পারবে না।” তাঁর বিনামূল্যে বাস সেবা, শিশু পরিচর্যা ও বাড়িভাড়া কমানোর প্রতিশ্রুতিগুলোই মূলত সাধারণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
চ্যালেঞ্জের মুখে ‘সমাজতন্ত্রী’ মেয়র
অভিষেক আনন্দ ছাপিয়ে মামদানির সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
তহবিল সংকট: ১০ লাখ পরিবারকে বিনামূল্যে সেবা দিতে প্রয়োজন প্রায় এক হাজার কোটি ডলার। এই অর্থ ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে সংগ্রহের পরিকল্পনা করলেও গভর্নর ক্যাথি হোকুলের অনুমোদন পাওয়া হবে কঠিন।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মামদানিকে ইতিপূর্বে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিলেও সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে তাঁদের সাক্ষাতে ট্রাম্পের ইতিবাচক আচরণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবাক হয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি জোহরানকে সাহায্য করতে চান।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা
অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পিউ বনিক বলেন, “মাইনাস ১০ ডিগ্রি শীতের মধ্যেও আমরা ৫০ হাজার মানুষ এসেছি ইতিহাসের সাক্ষী হতে। আমরা আশা করছি, সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য জোহরান কল্যাণকর কিছু করবেন।”
জোহরান মামদানির বাবা প্রখ্যাত অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি এবং মা বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার মীরা নায়ারের উপস্থিতিতে এই শপথ গ্রহণ কেবল নিউইয়র্কের জন্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রেই এক নতুন আখ্যান তৈরি করল।