—ছবি সংগৃহিত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে যখন বিশ্বজুড়ে বারুদের গন্ধ আর ধ্বংসলীলা, ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গের নিভৃত জেলা শহর দিনাজপুরে জন্ম নিয়েছিলেন এক শিশু। ১৯৪৫ সালের সেই অস্থির সময়ে পারিবারিক চিকিৎসক অবনী গোস্বামী পরামর্শ দিয়েছিলেন নবজাতকের নাম রাখা হোক ‘শান্তি’।
যুদ্ধের উন্মত্ততা শেষে পৃথিবীতে শান্তির আগমনের প্রতীক হিসেবে এই নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু শিশুটি ছিল পুতুলের মতো শান্ত আর সুন্দর; বড় বোন সেলিমা ইসলাম ভালোবেসে ডাকনাম রাখলেন ‘পুতুল’। সেই ‘পুতুল’ই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনীতির এক কিংবদন্তি বেগম খালেদা জিয়া।
শৈশবের দিনগুলি: দিনাজপুর থেকে বেড়ে ওঠা
খালেদা জিয়ার পৈতৃক নিবাস বর্তমান ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায় হলেও তাঁর বাবা এস্কান্দার মজুমদার ব্যবসার প্রয়োজনে জলপাইগুড়িতে থিতু হয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর তাঁরা দিনাজপুরে স্থায়ী হন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। শৈশবে তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও চপল ছিলেন। চাচাতো বোন নার্গিসের সঙ্গে স্কুলে নাচ শিখতেন।
তাঁর দীর্ঘ কেশরাজি ধোয়ার পর শুকানো ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা সামলাতেন তাঁর মা তৈয়বা খাতুন। মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়াঘেরা পরিবেশে বড় হওয়া এই মেয়েটি যে একদিন কোটি মানুষের মুক্তিদাত্রী হিসেবে রাজপথে আবির্ভূত হবেন, তা তখন কেউ কল্পনাও করেনি।
ক্যাপ্টেন জিয়ার সঙ্গে প্রণয় ও পরিণয়
তৎকালীন তরুণ ও মেধাবী ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান তখন সেনাবাহিনীতে কর্মরত। জিয়াউর রহমানের মা ছিলেন খালেদা জিয়ার মায়ের চাচাতো বোন। সেই পারিবারিক সূত্রেই প্রথম দেখা। জিয়াউর রহমান প্রথম দেখাতেই তাঁকে পছন্দ করেন এবং নিজের বাবার কাছে চিঠি লিখে বিয়ের অনুমতি চান।
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তাঁরা। তৎকালীন লোকমুখে প্রচলিত ছিল এক চমৎকার গল্প। এক ঘটক নাকি জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন, “এই পাত্রী এতই রূপসী যে তাঁকে ঘরে আনলে আর আলাদা করে বিজলি বাতির প্রয়োজন হবে না, তাঁর রূপের ছটাতেই ঘর আলোকিত হয়ে থাকবে।” বিয়ের দিন মায়ের দেওয়া লাল বেনারসি শাড়িতে সেজেছিলেন তিনি। বিয়ের পর প্রথম চার বছর দিনাজপুরের সেই ছায়া সুনিবিড় পরিবেশেই কাটিয়েছিলেন এই দম্পতি।
শখের জগত: যেখানে মিশে ছিল স্নিগ্ধতা
রাজনীতির কঠোর আর রুক্ষ ময়দানে আসার আগে বেগম জিয়া ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন ও ফুলপ্রেমী। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আগে আমার শখ ছিল ফুলের বাগান করা।” ফুল সংগ্রহ করা ছিল তাঁর প্যাশন। এমনকি রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে গেলেও কেউ কিছু উপহার দিতে চাইলে তিনি কেবল ফুলটাই পছন্দ করতেন। দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে কাটানো তাঁর ঘরোয়া মুহূর্তগুলোর আলোকচিত্র আজও তাঁর মাতৃত্বময়ী রূপের সাক্ষ্য দেয়।
রাজনীতিতে অভিষেক: এক অবিনাশী শক্তি
১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে স্বামী জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে আসার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। ভাই ও বাবা তাঁকে সরিয়ে রাখতে চাইলেও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের প্রচণ্ড চাপে এবং দেশের ক্রান্তিলগ্নে তিনি রাজপথে নামেন। ১৯৮৪ সালে বিএনপির হাল ধরেন তিনি।
নির্বাচনী ইতিহাসে তিনি এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। ১৯৮৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং প্রতিটি আসনেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি একমাত্র নেত্রী, যিনি কোনো নির্বাচনে কখনো পরাজিত হননি। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ‘শান্তি’ ছিল প্রধান লক্ষ্য। বাবার এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমি বড় কোনো পদে থাকতে চাই না, কেবল দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র আর শান্তি আসুক এটাই চাই।”
এক যুগের অবসান
পুতুল থেকে শান্তি, শান্তি থেকে খালেদা খানম এবং সবশেষে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিক্রমা শেষ করে তিনি এখন স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত। তাঁর মৃত্যুতে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভিভাবক বিয়োগ হয়নি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর সেই অদম্য জেদ আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেঁচে থাকবে।