—ছবি সংগৃহিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘতম ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। জীবনের অমোঘ সত্যকে আলিঙ্গন করে চিরবিদায় নিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
তাঁর এই প্রস্থানে শোকে স্তব্ধ রাজনৈতিক অঙ্গন। দল-মত নির্বিশেষে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সর্বত্র। এই শোকাতুর মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে এক আবেগঘন ভাষ্য দিয়েছেন সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
ড. কামালের মূল্যায়ন: এক অনন্য প্রেরণা আজ মঙ্গলবার এক বিশেষ শোকবার্তায় ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমরা একজন দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক অভিভাবককে হারালাম। দেশের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।’ ড. কামাল হোসেন মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানকে হারানোর পর এক চরম দুঃসময়ে খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বেই বিএনপি ভেঙে না গিয়ে বরং আরও শক্তিশালী হয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
আপসহীন নেত্রীর অবিনাশী স্মৃতি ড. কামাল হোসেন তাঁর ভাষ্যে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘তিনজোটের রূপরেখা প্রণয়ন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব জাতি আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’ দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে বারবার কারাবরণের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তাকে ড. কামাল আগামী প্রজন্মের জন্য ‘অনুকরণীয়’ বলে অভিহিত করেন।
জুলুম ও ত্যাগের এক বিষণ্ণ অধ্যায় শোকবার্তায় ড. কামাল হোসেন অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বিগত সরকারের সময় খালেদা জিয়ার ওপর যে ‘সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন ও তাচ্ছিল্য’ করা হয়েছে, তা দেশের মানুষ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। তাঁর মতে, শাসকগোষ্ঠীর সেই নিষ্ঠুরতা খালেদা জিয়াকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে গেছে এবং তিনি হয়ে উঠেছেন ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক’।
সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত রুচির মিশেল খালেদা জিয়ার জীবন ছিল বৈপরীত্যে ঘেরা। একদিকে রাজপথের ধুলোবালি আর কাঁদানে গ্যাস, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর ছিল মার্জিত রুচিবোধ। ১৯৪৬ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া এই নেত্রী, যাঁকে আদর করে ডাকা হতো ‘পুতুল’, শৈশব থেকেই ছিলেন পরিপাটি ও ফুলের অনুরাগী। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দী হিসেবে সেনানিবাসে কাটানো বিভীষিকাময় দিনগুলো থেকে শুরু করে ২০১০ সালে সেনানিবাসের মইনুল রোডের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে অশ্রুসজল বিদায়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অসীম ধৈর্য ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন।
শেষ বিদায়ের করুণ সুর ড. কামাল হোসেন তাঁর বার্তায় খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিকদের জীবনে মামলা-মোকদ্দমা বা গ্রেপ্তার থাকে, কিন্তু বেগম জিয়া যেভাবে স্বামী ও সন্তান হারানোর শোক বুকে চেপে দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা সহ্য করেছেন, তা তাঁকে মহৎ চরিত্রগুলোর মতো মহীয়ান করে তুলেছে।’
বর্তমানে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। ড. কামালের এই ভাষ্য আজ যেন সাধারণ মানুষের মনের কথাই প্রতিধ্বনি করছে—বাংলাদেশ আজ এক লড়াকু অভিভাবককে হারিয়ে সত্যিই এতিম হলো।