ধান কাটায় নারী-পুরুষের দিনভর উৎসব
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় চলছে আমন ধান কাটার মৌসুম। মাঠের পর মাঠ জুড়ে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। সেই ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এলাকার নারী-পুরুষ কৃষক। সকাল থেকে সন্ধ্যা—শীতের হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে দল বেঁধে মাঠে নেমে পড়ছেন সবাই।নতুন ধান কেটে বাড়িতে আনায় নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে সৌরভ ছড়াচ্ছে কৃষকের ঘর।
অন্যদিকে, নতুন ধান কেটে মাড়াই করে খড়ের দামও পাচ্ছে কৃষক। এতে কৃষকরা খুশি। এমনি দৃশ্য এখন প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে উপজেলাজুড়ে।
কৃষি অফিসসূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে উপজেলায় বোরো আমান ধান চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪৪৮৫হেক্টর এবং চলতি মৌসুমে তা অর্জিত হযেছে। উপজেলায় চলতি বোরো আমন মৌসুমে উপসি ও স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা হয়েছে।
উপসি জাতের মধ্যে ব্রি-ধান-৩৪,৪৯,৭৫,৮৭,৯৩,৯৫,৯০১০৩চাষ সহ স্থানীয় স্বর্ণা এবং আতব জাতের ধানের চাষবাদ করেছে। বোরো আমন মৌসুমে ঝড় বৃষ্টিতে ধানের ক্ষতি হয় তাই উপজেলা কৃষি অফিস ব্রি-ধান ১০৩.৮৭,৭৫ জাতের ধান লাগানোর পরামর্শ দিয়ে থাকি।
যাতে কৃষকের ক্ষতি যেন না হয়। চলতি মৌসুমে অসময়ের বৃষ্টিতে স্বর্ণা সহ কিছু জাতের ধানের গাছ পড়ে যায় আমরা দ্রুতই লজিংআপ পদ্ধতিতে ধানের গাছগুলো দাঁড় করানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছি।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের সব গ্রামেই চলছে ধান কাটা মাড়াই।এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমন ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। ফলে ঘরে তোলার আনন্দে তাদের মাঝে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।
ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর প্রতিটি ধাপে একসঙ্গে কাজ করছেন নারী-পুরুষ শ্রমিক। কেউ কাঁচি দিয়ে ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত।যান্ত্রিক থ্রেশার মেশিনের শব্দে প্রকম্পিত গ্রামের মেঠোপথ। আধুনিক যন্ত্রের পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতিতেও চলছে মাড়াই। মাঠ থেকে ধান বাড়িতে আনার পর কৃষানিরা ব্যস্ত ধান শুকানো, উড়ানো ও সংরক্ষণের কাজে।
শ্রমিক সংকট থাকলেও পরিবারভিত্তিক শ্রম ভাগাভাগি করে কাজ করায় ধান তোলা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ধান ঘরে তুলতে পারলে তারা রবি মৌসুমের নতুন ফসলের প্রস্তুতিতেও নামবেন।
মাঠজুড়ে ব্যস্ততার এ দৃশ্য এখন বদলগাছীর প্রতিটি গ্রামেই। কৃষকের ঘরে নতুন ধানের ঘ্রাণ আর মুখে তৃপ্তির হাসি—গ্রামীণ জীবনকে আবারো করে তুলেছে প্রাণবন্ত।
এসময় বিলাসবাড়ির মামুন বলেন, অতি বৃষ্টিতে আগাম জাতের ধানের কিছুটা ক্ষতি হলেও এখন আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার ধানের ক্ষেতে তেমন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়নি।
ফলনও ভালো হয়েছে।
এরপর রবি ফসল চাষের জন্য দ্রুত জমি প্রস্তুত করা হবে। আশা করছি ধানের ভালো দাম পাব। ধান কাটার পর অনেক কৃষক এই জমিতে এখন আলু, ভূট্টা, গমসহ শীতকালীন সবজি চাষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে আবার কেউ শুরু করেছেন।
ধানকাটা লোকের সরদার বাদেশ জানান, ধান কাটার মৌসুমে আমদের দম ফেলানোর সময় নেই। ভোর থেকে সন্ধা পর্যন্ত ধান কাটা ও মাড়াইয়ে আমরা ব্যস্ত থাকি। আমরা পুরুষ মানুষরা গেরস্তের সাথে জমির ধান কাটা,তোলা ও মাড়াই করার চুক্তি করি।
পুরুষ শ্রমিকরা ভোর থেকে কাজ করে আর আমাদের সাথে থাকা নারী শ্রমিকরা সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কাজ করে। ধান কাটা শ্রমিক রুবেল বলেন , ধান কাটার সময় এবার বর্ষা নেই ফলে মাঠেও কোনো পানি নেই।
আমাদের ধান কাটতে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমরা ৮ জন এক সঙ্গে ধান কাটছি। ধান কাটা-মাড়াইতে বিঘাপ্রতি ৪০০০ থেকে ৪৫০০ হাজার টাকা নিচ্ছি। দিনে দেড় থেকে দুই বিঘা জমির ধান কাটতে পারছি।
জিধিরপুর গ্রামের কৃষক বাবু জানান, এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে সেচের তেমন খরচ হয়নি। তবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় খরচ বেড়েছে।এবার নভেম্বর মাসের শুরুতে অসময়ের বৃষ্টিতে নিচু জমির ধান পড়ে যায়। কৃষি অফিসের পরামর্শে লজিংআপ পদ্ধতিতে ধানের গাছ দাড় করেছি এতে ফলন কম হলেও ক্ষতি পুষে যাবে। তবে এ বছর খরের দাম ভালো।
এ ব্যপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ সাবাব ফারহান কথা হলে তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবং বৃষ্টিপাতের পানি পর্যাপ্ত হওয়ায় আমন ধানে তেমন কোন সেচের পানি ব্যবহার করতে হয়নি।
তবে আকস্মিক অনাবৃষ্টিতে নিচু জমির ধান পড়ে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিক ভাবে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পড়ে ধানকে দাঁড়ানোর জন্য লজিংআপ পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি তাতে কৃষকের ফলনে খুব বেশি ঘাটতি হবে না।