—ছবি মুক্ত প্রভাত
থৈ থৈ পানি, ফুল আর নানা প্রজাতির মাছে বিলের অবারিত সৌন্দর্য্য প্রকাশ পেত। দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে ধোয়া, পানি আর সাদা মেঘ মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত। এমনই বহুমাত্রিক চরিত্র ছিল দেশের উন্মক্ত জলারাশির সবচেয়ে বড় চলনবিলের। নানা পন্থায় শাসনের ফলে ৮০০ বর্গকিলোমিটারের পানি সম্পন্ন বিল গত ৫ দশকে ৬৬ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।
দখল-দুষণে নদী-নালার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন, কঙ্কিটের স্থাপনা নির্মাণ, বিলের বুক চিরে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করে বদলে দেওয়া হয়েছে চলনবিলের সেই অবারিত সৌন্দর্য্য। মৃতপ্রায় হয়ে গেছে চলনবিল কেন্দ্রিক আত্রাই, নন্দকুঁজা ও গুমানী, বড়ালসহ ২২ টি নদ-নদী। এসব কারণে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে এই অঞ্চলে বহু মানুষ। ভয়াবহ বিপর্যয় ধেয়ে আসলেও চলনবিলের উন্নয়নে সরকারের কার্যত কোনো প্রকল্প নেই।
চলনবিল ও নদ-নদীর অতিত
১৮৮১ সালে প্রকাশিত ‘ইম্পেরিয়েল গেজেট অব ইন্ডিয়া’ নামের ব্রিটিশ-ভারতের ঐতিহাসিক গ্রন্থে চলনবিলের ভৌগোলিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়। ওই গ্রন্থে বলা হয়- নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁও জেলা নিয়ে চলনবিল। ১৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, ৪২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গ কি.মি. আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খাল নিয়ে ৫০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল এই বিল। চলনবিলে প্রধান নদী ৯টি, ২০টি খালসহ ছোট ছোট বিভিন্ন বিল ও খাল রয়েছে। অতীতে ২৩ হাজারের মত বড় বড় পানির আধার ছিল। নদীগুলোর মধ্যে আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, বড়াল, তুলসিগঙ্গা, চেঁচিয়া, ভাদাই, চিকনাই, রূপনাই, বানগঙ্গা ইত্যাদি। ১৮টি খালের মধ্যে নবীরহাজির জোলা, হক সাহেবের খাল, নিমাইচড়া খাল, বেশানীর খাল, গুমানী খাল, উলিপুর খাল, সাঙ্গুয়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলার খাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. মো. রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে পাওয়া তথ্যে জানাগেছে- প্রায় তিন দশক আগেও চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীতে বছর জুড়েই ৬ থেকে ১২ ফুট পানি থাকত। ফলে সারা বছর নৌচলাচল করতো। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে বিস্তৃর্ণ বিল আর প্রবাহমান নদী ভরাট হয়ে গেছে। পরিসংখ্যানমতে, প্রতি বছর ২২২১/২ মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করে। পানি নেমে গেলে ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বর্ষায় চলনবিল ত্যাগ করে। অবশিষ্ট ২৬৯১/২ মিলয়ন ঘনফুট পলি নদ-নদীসহ চলনবিলে স্থিতি থাকে।
প্রাণহীন বিলের বর্তমান
বাংলাদেশ সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলের ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পানি ছিল ১৯৭৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে। এর পর গত ৫০ বছরে উন্মুক্ত জলারাশির সেই আয়তন ৯২ শতাংশ কমে ২০২৫ সালে এসে ৬৬ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। মূলত চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সড়ক ১ হাজার ১৮৮ কিলোমিটার, ১১৩টি সেতু এবং ৮৫৫টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। স্লুইসগেটসহ ১৮০টি নিয়ন্ত্রণমূলক স্থাপনাও নির্মিত হয়েছে। এসব কারণে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে চলনবিল তার চরিত্র হারিয়েছে।
যেভাবে শুরু চলনবিলের ধ্বংস
বাংলাদেশ সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)’-এর গবেষণা বলছে, ১৯৭৫ সাল নাগাদ চলনবিলের বুকচিরে কেবল রেললাইন, রাজশাহী-নওগাঁ ও বগুড়া-নাটোর সড়ক নির্মাণ হয়েছে। তখনও বিলের ৮০০ বর্গকিলোমিটারে পানি ছিল। কিন্তু ১৯৮৫ সালের দিকে এসে দশ বছরের ব্যবধানে ৫টি পোল্ডার এবং ৯১টি নিয়ন্ত্রণমূলক স্থাপনা নির্মিত হয়। এতে চলনবিলে সংকট প্রকট হতে থাকে। নাটকীয়ভাবে বদলে যায় গোটা পরিস্থিতি। ওই বছরের মার্চে এসে ৫২০ বর্গকিলোমিটার কমে ২৮০ বর্গকিলোমিটারে পানি থাকতে দেখা যায়।
গবেষণা বলছে, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দশ বছরে চলনবিলে পোল্ডারের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৪ তে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে পানি নিয়ন্ত্রণের স্থাপনার সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে হয়ে ১৮০। ফলাফল হিসেবে ২৩০ বর্গকিলোমিটার কমে ওই বছরের শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের মাত্র ৮০ বর্গকিলোমিটারে পানি ছিল। ২০১৫ সালের দিকে পোল্ডারের সংখ্যা বেড়ে ১৫ হয়। পানি নিয়ন্ত্রণমূলক স্থাপনার সংখ্যা হয় ২১৫। বদ্ধ পানিতে মাছ পদ্ধতি অবলম্বন করে গড়ে তোলা হয় হাজার হাজার অপরিকল্পীত পুকুর। ১৯৯৫ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে চলনবিলে পানি ছিল মাত্র ৬৬ বর্গকিলোমিটারে।
বড়ালের মুখে সরু স্লুইসগেটে বড় সর্বনাশ
নদীটির নাম প্রমত্তা বড়াল। পদ্মায় জন্ম আর যমুনায় বিলিন। ২২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীর পেট চিরে জন্মেছে নদী-নালা, খাল-বিল। পদ্মা-যমুনার পানি এই নদী হয়েই গড়িয়ে পড়তো দেশের সর্ববৃহৎ চলনবিলে। অথচ ৫’শ ফিট প্রস্থের নদীটির উৎসমুখে ১৯৮৪ সালে নির্মীত হয়েছে তিন কপাটের একটি সরু স্লুইসগেট। সেই থেকে বড়াল তার যৌবন হারিয়েছে। যৌবন হারিয়েছে বড় বড় নদীও। একইসঙ্গে চলনবিলও এর বুক চিরে বয়ে যাওয়া ৪০টির মতো নদী, শ’দুয়েক নালা এবং অন্তত ২৫০টি বিল মৃতপ্রায় হয়ে গেছে। ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে মিলিয়ে গেছে বেশকিছু নদীর চিহৃ।
বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান জানান, দেশের বৃহত্তম পদ্মা-যমুনা নদী এবং বিশাল জলাভূমির চলনবিলের মধ্যে প্রধান সংযোগ নদী বড়াল। এই নদীতে অপরিকল্পিতভাবে স্লুইচগেট নির্মাণের ফলে ৩৮ বছরে ২২০ কিলোমিটার নদীর মধ্যে বড়ালের ১২০ কিলোমিটার বেদখল হয়েছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ফারাক্কার বাঁধের বিরুপ প্রভাব পড়ে চলনবিলে। বড়াল নদীর চারঘাট পৌরসভা ৬শ ফিট দখল করে দুইটি স্থাপনা নির্মাণ করেছে। চাটমোহর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সংলগ্ন আরো ৮শ ফিট নদী দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছে চাটমোহর পৌরসভা। এছাড়া পাবনার আটঘরিয়া থেকে বনপাড়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার নদী দখল করে সরকারি অফিসসহ ব্যক্তিমালিকানা বহু স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে।
নতুন সমস্যা চলনবিলে বিশ্ববিদ্যালয়
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়া এলাকায় পূর্ব চলনবিলের শেষ অংশে এসে খাল, বিল, বড়ালসহ অর্ধশত নদীর পানি মিলেমিশে একাকার। অন্তত শতাধিক উৎস থেকে আসা পানির সম্মিলিত প্রবাহ যমুনা নদীতে মিলিত হয়। অথচ উন্মুক্ত পানির সেই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে অধিক ব্যায়ে এখানে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করতে চায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পরিবেশ ও পানিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল-বিল আর নদীর মিলনস্থলে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে পানির প্রবাহ বন্ধ হবে। ফলে চলনবিলের জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, অন্যদিকে পানির এই শক্তিশালী প্রবাহ বাধা পেলে তা আশপাশের এলাকার জন্য জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রকোপ বাড়িয়ে তুলবে।
খনন হলেও ফেরেনি নাব্যতা
চলনবিলের বুক চিড়ে যে কয়টি নদীর প্রবাহ তার মধ্যে অন্যতম বড়াল, আত্রাই, গুমানী, তুলশীগঙ্গা। বাঘাবাড়ি থেকে উত্তর জনপদের প্রায় আটটি জেলাতে নৌ চলাচলের মাধ্যম ছিল এসব নদী। জৌলুশ ফেরাতে বছর দুয়েক আগে এই চারটি নদীর কিছু কিছু অংশ খনন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল নদীর প্রস্থ ও গভীরতা বৃদ্ধি এবং নাব্যতা ফেরানো। যাতে নৌ-চলাচলে গতি বাড়ে, বিল এলাকার মানুষ নদীর পানিতে সেচ সুবিধা পান এবং উন্মুক্ত জলরাশিতে মাছ শিকার করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এসবের কিছুই হয়নি। নদী খনন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাব্যতা ফেরেনি। খননের উচ্ছিষ্ট মাটিতেই আবার সংকুচিত হয়েছে এসব নদী। নদী পাড়ের বাসিন্দাদের দাবি, প্রতিটি নদী খননের ক্ষেত্রেই নানা অনিয়ম অসংগতি ফুটে উঠে। কোনো নদীই ঠিকঠাক খনন করা হয়নি। ফলে বিল আর নদীতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় ভূগর্ভস্ত পানির স্তরও আশঙ্কাজনকহারে নিচে নেমেছে।
নদী রক্ষা আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দখলের কবলে পড়ে চলনবিল এবং নদী নালায় পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া চলনবিল অঞ্চলের কয়েকটি শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য বড়াল, নন্দকুঁজাসহ কয়েকটি নদীর পানিতে মিশে দুষণ সৃষ্টি করায় পরিবেশে ব্যপক প্রভাব পড়ছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্যও।
চলনবিল ও নদী রক্ষায় আন্দোলন
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বড়াল রক্ষা আন্দোলন, চলনবিল রক্ষা আন্দোলন, নাগরিক সমাজ নামের সংগঠন ২০০৮ সাল থেকে চলনবিল ও নদ-নদী রক্ষায় আন্দোলনে নামে। নাটোর, পাবনা ও রাজশাহীর সংসদ সদস্যরাও ওই আন্দোলনে একাত্তা ঘোষণা করেন। বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে নদী পাড়ের চার জেলার আট উপজেলার মানুষ নিয়ে রাজশাহীর চারঘাটের পদ্মা নদীর উৎস মুখ থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িঘাট পর্যন্ত ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর বৃহত্তম মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে।
বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব ডিএম আলমগীর জানালেন, চলনবিলের দূষণ রোধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বড়াল নদী চালু ও তা রক্ষার জন্য জনদাবীর মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড টাস্কফোর্স গঠন করে। নদী বিষয়ক টাস্কফোর্স এবং ভুমি মন্ত্রনালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় বড়াল নদীর সব বাধা অপসারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। বাস্তবে বিলের জৌলুশ ফেরাতে এবং নদী উদ্ধারে এখ নপর্যন্ত কিছুই করা হয়নি।
জেলেদের পেশা বদল ও দুর্দিন
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী সংলগ্ন এলাকায় ফসলহানি, নদী ও বিলের পানি দুষণ করায় দুর্গন্ধ-রোগবালাই ছড়াচ্ছে। একশ্রেণির ভুমি দস্যুরা দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখায় জলাশায় এবং ফসলি জমি কমছে। এতে করে জেলে-কৃষক, ব্যবসায়ীরা বেকার ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের চলনবিল মৎস্য প্রকল্প থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ হতে ২০০৬ সালের মধ্যে এক সমীক্ষায় দেখা যায়Ñ ১৯৮২ সালে মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬১ জন জেলে চলনবিল এবং নদ-নদী ও খাল জলাশয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পর্যায়ক্রমে কমতে কমতে ২০০৬ সালে জেলের সংখ্যা ৭৫ হাজারে দাঁড়ায়। বর্তমানে চলনবিলের জেলেরা পেশা বদলেছেন। যারা এই পেশায় আছেন খাল-বিল, নদী-নালায় পানি না থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে তারা দুর্দিন পাড় করছেন।
চলনবিল রক্ষায় করনীয়
চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের সদিচ্ছায় ধুঁকতে থাকা চলনবিলের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। চলনবিলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, জলাশায় সৃষ্টি ও প্রমত্তা পদ্মার শাখা নদী বড়াল দখলমুক্ত করে নাব্যতা ফেরাতে হবে। বাঁধ অপসারণ, অন্যান্য নদী পুনঃখনন, অপ্রয়োজনীয় স্লুইচগেটগুলো অপসারণ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় আনতে হবে চলনবিলের অন্তত ২৬টি প্রধান নদ-নদী। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করলে নদীর প্রবাহ ফিরলে প্লাবিত হবে বিস্তৃর্ণ চলনবিলও।
তিনি বলেন, নদী আর নৌকাকে ঘিরে বিলের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়, নাজিরপুর, সিংড়ার, বড়াইগ্রামের আহম্মেদপুর, তাড়াশের ধামাইচ, নাদোসৈয়দপুর, চাটমোহরের ছাইকোলা, অষ্টমনিষা, মির্জাপুর ভাঙ্গুড়া, নওগাঁওসহ সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছিল বড় নৌবন্দর। বিল এবং নদী দখলমুুক্ত করে পানির প্রবাহ ফেরানো গেলে আবাও চলনবিল প্রাণ ফিরে পাবে, কর্মসংস্থান হবে বহু মানুষের।
চলনবিল ও এখানকার বাস্তÍতন্ত্র নিয়ে গবেষণা চলমান রেখেছেন বাস্ততন্ত্র গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যপক ড. মো. মনিরুজ্জামান সরকার। চলনবিলকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে তা সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি এই গবেষকের। তিনি মনে করেন, চলনবিল শুধু একটি বৃহৎ বিল-ই নয়, এটি একটি বৃহৎ জলজ বাস্ততন্ত্রের আধার। এই বিলের প্রাণ ফিয়ে আনা সম্ভব। চলনবিলকে বাঁচাতে হলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা জরুরী। একই সঙ্গে বিল অঞ্চলে নতুন করে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করতে না দেওয়া। তাছাড়া চনবিলে কোনো ধরণের নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে বাস্ততন্ত্র গবেষকদের পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা চালু করতে হবে। বিলকে যতেচ্ছাভাবে দূষণরোধে সরকারিভাবে কর্মসূচি নিয়ে, প্রয়োজনে আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, চলনবিল উদ্ধার, সংরক্ষণ ও রক্ষায় একটি ‘চলনবিল কর্তৃপক্ষ’ গঠন করতে হবে। অপরিকল্পিত বাঁধ, স্লুইসগেট অপসারণ এবং সিএস নকসা অনুযায়ী, চলনবিল এলাকার সব নদী, খাল ও জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণ করে দখল ও দূষণমুক্ত করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। খুব দ্রুত বন্ধ করতে হবে চলনবিলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বছরখানেক আগে ‘বড়াল নদীর অববাহিকায় পানি সম্পদ পুনরুদ্ধার’ নামে একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়ে ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় বড়াল নদীর ১০৪ কিলোমিটার, নারোদ নদীর ৪৩ কিলোমিটার এবং মুসাখাঁ নদীর ৬ কিলোমিটার খননের কথা বলা হয়েছে। কিন্ত প্রকল্পটির প্রস্তাব ফেরত এসেছে। পুনর্মূল্যায়ন করে আবারো প্রকল্পটি পাঠাতে কাজ চলছে।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিফাত করিম জানান, বড়ালের উৎসমুখে নির্মীত স্লুইসগেটটি বর্তমানে কোনো কাজে আসছে না। স্লুইটগেটটি অপসারণ করে বড়াল খনন করা হলে চলনবিল ও অন্যান্য নদী বড়ালের পানিতেই প্লাবিত হবে। দুর হবে চলনবিলের নানা সংকট।
বড়াল নদীর চারঘাট এলাকা পরিদর্শনে এসে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, নদীগুলোতে এতো দিনের দখল-দূষণ স্বল্প সময়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে প্রতিটি বিভাগের একটি করে নদী দখল-দূষণ মুক্ত করার কাজ শুরু করেছেন তারা। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলাতেও একটি করে নদী দখল-দূষণমুক্ত করার রূপরেখা করে যাবেন।