—ছবি মুক্ত প্রভাত
সিরাজগঞ্জ জেলা ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে কর্মরত প্রসেস সার্ভেয়ার মো: জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জমির কাগজপত্র তুলে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া এই অফিসে কোনো কাজই করেন না জাহাঙ্গীর। মাত্র চার মাস আগে নিরাপত্তা প্রহরী থেকে প্রসেস সার্ভেয়ার পদে দায়িত্ব পাওয়া জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
জানা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে সাধারণ মানুষ তাদের জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যেমন খতিয়ান, খাজনা-খারিজের কাগজ, জমির পুরোনো রেকর্ড ও দলিলের অনুলিপি তুলতে সিরাজগঞ্জ জেলা ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে আসেন।
নিয়ম অনুযায়ী, এসব কাগজ উত্তোলনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রসেস সার্ভেয়ার জাহাঙ্গীর আলম সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রতিটি কাজের জন্য ভুক্তভোগীদের সাথে মোটা অংকের টাকার চুক্তি করেন। টাকা না দিলে কাজ তো হয়ই না, উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয় বলে জানিয়েছেন অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, তার ১১টি খতিয়ান তোলার জন্য জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ৪ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে। এই টাকা কাজের শুরুতেই তাকে অগ্রিম দিতে হয়েছে। জাহাঙ্গীর তাকে আশ্বস্ত করেছেন, কয়েকটি খতিয়ান তিনি ইতোমধ্যেই তুলে দিয়েছেন এবং বাকিগুলোও দ্রুত তুলে দেবেন। তবে পুরো কাজ শেষে তাকে আরও কিছু ‘বকশিস’ দিতে হবে বলেও জানিয়েছেন জাহাঙ্গীর।
আরেক ভুক্তভোগী তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি জমি সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র যাচাই-যাচাইয়ের জন্য জাহাঙ্গীর আলমের কাছে গিয়েছিলেন। প্রথম সাক্ষাতেই জাহাঙ্গীর তাকে বলেন, আপনার সব কাগজপত্র নিয়ে আসেন, আর সাথে হাজার দুই টাকা নিয়ে আসেন। কাগজপত্র দেখে বলতে পারব মোট কত টাকা খরচ হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম তাড়াশ উপজেলার চকরছুল্লাহ গ্রামের জমসেদ আলীর ছেলে। তার গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, জাহাঙ্গীর একসময় অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, কয়েক বছর আগেও তার পরিবার অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই তার অবস্থা আশ্চর্যজনকভাবে বদলাতে শুরু করে।
তার গ্রামের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাহাঙ্গীর কি এমন আলাদিনের চেরাগ পেল যে চাকরিতে ঢোকার পরই প্রতি দুই-চার মাস পরপর জমি কেনে? নিজের বাড়ির সাথে একটি মার্কেটও তৈরি করেছে। শুধু গত এক বছরেই সে প্রায় তিন বিঘা জমি কিনেছে। আমরা তার এই ফুলেফেঁপে ওঠার উৎস জানতে চাই।
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রসেস সার্ভেয়ার জাহাঙ্গীর আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনো কিছু বলতে পারব না। কারণ আমি এগুলোর সাথে জড়িত নই।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এনডিসি) ফজলে রাব্বির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা প্রমাণিত হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মচারী কীভাবে অল্প দিনেই এত বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে যান? তাদের দাবি, শুধুমাত্র জাহাঙ্গীর আলমই নন, এর পেছনে আরও কোনো প্রভাবশালী চক্র জড়িত আছে কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী জনসাধারণ ও এলাকাবাসী এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, এই সংবাদটি যেন যথাযথ গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।