—ছবি মুক্ত প্রভাত
বাংলাদেশের ঈদুল আযহার সময় কোরবানির পশু পরিবহন একটি চেনা চিত্র। এই সময়ে গ্রামের খামারিদের জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—সারা বছর যত্নে পালন করা গরুগুলোকে নিয়ে রাজধানীর বাজারের পথে রওনা দেওয়া। এই যাত্রা শুধু পশু পরিবহনের নয়, এটি এক একটি জীবনের, এক একটি স্বপ্নের এবং এক একটি পরিবারের আশা-ভরসার পথচলা।
ছবিতে দেখা যায়, একটি ট্রাকে গরু বোঝাই করে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গাড়ির উপর বসে থাকা শ্রমিকদের মুখে ক্লান্তির রেখা, কিন্তু চোখে স্পষ্ট ভবিষ্যতের স্বপ্ন। গাড়ির গায়ে বাঁধা রয়েছে বাঁশ, দড়ি, ড্রাম, চটসহ আরও অনেক উপকরণ—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটি একটি পরিপূর্ণ প্রস্তুতি। কাঁচা ও সংকীর্ণ রাস্তা, ধুলা আর কাঁদার মধ্য দিয়ে তারা এগিয়ে চলেছে অটুট মনোবলে।
এই গরুগুলোর সাথে যুক্ত থাকে শুধু অর্থ নয়, থাকে অগাধ ভালোবাসা। প্রতিটি পশু যেন একেকটি পরিবারের সদস্য। কেউ রাত জেগে পাহারা দিয়েছে, কেউ দিনের পর দিন খাবার যোগাড় করেছে, কেউ আবার নিজের চিকিৎসা বাদ দিয়ে গরুর সেবায় মন দিয়েছে। অবশেষে সেই প্রিয় প্রাণীগুলো ঢাকার বাজারে পৌঁছে দেবে এমন এক সম্ভাবনা, যা বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের ভাগ্য।
এই যাত্রা তাই শুধুই বাণিজ্যিক নয়। এটি শ্রম, সময়, আত্মত্যাগ আর ভালবাসার সমন্বয়ে গঠিত এক মর্মস্পর্শী বাস্তবতা। প্রতিটি গাড়ি যেন একটি করে গল্প, প্রতিটি গরু যেন একটি করে অধ্যায়। সেই গল্পে থাকে পরিশ্রমের ঘাম, স্বপ্ন পূরণের আকুতি, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর আশা কিংবা একটি ঘর মেরামতের পরিকল্পনা।
তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও এক তীব্র সত্য রয়েছে—এই বাজারে সবাই গরু বিক্রি করে না, কেউ কেউ বিক্রি করে ভালোবাসা। টাকার জন্য কেউ সম্পর্ক বিসর্জন দেয়, কেউ বিশ্বাস ভাঙে, কেউ বিক্রি করে আত্মার বন্ধন। কোরবানির পশুর হাট তাই কখনো কখনো হয়ে ওঠে সমাজের মূল্যবোধেরও আয়না।
শেষ পর্যন্ত, এই যাত্রা কেবল এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া নয়, এটি জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে টিকে থাকার নাম। ঢাকায় গরু নিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যাদের জীবনে সুযোগ কম, তাদের লড়াই অনেক বেশি। আর সেই লড়াইয়ে আছে অগণিত মানুষের নিরব ভালোবাসা, প্রতিদিনের সংগ্রাম, আর ভোরবেলার একফোঁটা আশার আলো।