গুরুদাসপুর (নাটোর): সর্বহারা দাবি এই চিঠি দিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়।—ছবি সংগৃহিত
সাদা কাগজের উপরিভাগে লাল রঙের আস্তর। এমন চিঠিতে সর্বহারা পরিচয়ে তিন ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ লাখ করে ১৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়ছে। অর্থ জোগাতে সময় দেওয়া হয়েছে ৫দিন। অন্যাথায় ছেলেকে জবাই করে মাথা পাঠিয়ে দেয়ার হুমকিও দেওয়া হয় ওই চিঠিতে।
গুরুদাসপুর পৌর শহরের রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের সামনের বাসিন্দা শিক্ষক উত্তম কুমার কুন্ডু, প্রধান শিক্ষক বাবুল সরকার ও ব্যবসায়ী সোহেল আনোয়ারের বাড়ির সামনে মঙ্গলবার দুপুরে ওই চিঠি পাওয়া যায়। চিঠিতে প্রাপক হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। প্রেরক হিসেবে সর্বহারা দাবি করা হয়েছে। হুমকি ভরা চিঠি পাওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতংক বিড়াজ করছে। যে মহল্লায় সর্বহারার চিঠিখানা পাওয়া গেছে—সেখানে হিন্দু-মুসলিমদের বসতি রয়েছে। রয়েছেন সরকারি বেসরকারি একাধিক চাকুরিজীবিও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বুধবার দুপুরে এক শিক্ষক বলেন, তিনিসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক তার বাড়ির আশপাশে বাস করেন। নিজের বাড়ির মূল ফটকের সামনের পথে একটি চিঠি পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। চিঠিটি উদ্ধারের পর শিউড়ে উঠেন। সেখানে টাকা চেয়ে হুমকির বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সর্বহারা দাবি পাঠানো চিঠিতে লেখা রয়েছে— ‘ সর্বহারা- আশা করি মহান আল্লাহর দোয়ায় ভালই আছেন। দোতলা বাড়ি ছেলে বউ সব মিলিয়ে ভালো আছেন। আমরা ভালো নাই। বছরের বেশিরভাগ সময় জেলে থাকি আর যেটুকু সময় বাইরে থাকি গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করি। আপনাকে ৫ দিন সময় দেয়া হলো। এই পাঁচ দিনের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকার ব্যবস্থা করে রাখবেন। তাছাড়া আপনার ছেলেকে জবাই করে মাথা পাঠিয়ে দেবো আপনার বাড়িতে। পুলিশ কিংবা যেকোনো বাহিনী আমাদের ধরতে পারবে না। আপনার ছেলের গলা কাটা লাশ হয়ে যাবে।—সর্বহারা। টাকা কোথায় কিভাবে দিবেন আমরা তা জানিয়ে দিব’।
সর্বহার এমন হুমকি বার্তা বহন করা চিঠির কথা জানাজানি হওয়ায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেখানকার অন্তত ৫ জন বলেন, গুরুদাসপুর থানা মোড় থেকে বাজার পর্যন্ত জনবহুল মহল্লা। এখানে কোনো অপৃত্তিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে বছর দুয়েক আগে অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে একই জায়গার এক বিকাশ এজেন্টের কাছ থেকে চাঁদা চাওয়া হয় সর্বহারা পরিচয়ে। বিষয়টি নিয়ে সেসময় আর তেমন কিছু হয়নি। এই মহল্লায় সর্বহারার এটি দ্বিতীয় বার্তা। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
সহকারি অধ্যপক উত্তম কুমার কুন্ডু জানান, দুপুরে তিনি দোতলা বাড়ির নিচে খামের ভেতর একটি চিঠি পান। সেখানে ৫ দিনের মধ্যে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। না দিলে সন্তানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এধরণের ঘটনা তার সাথে প্রথম ঘটেছে।
সূত্র বলছে, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার ছয়টি থানা এলাকায় বিস্তার লাভ করে সর্বহারা। তাড়াশের উত্তরমুখ ও থালগাড়ি এলাকায় এই সংগঠনের ঘাঁটি ছিল। ১৯৮৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সর্বহারা সদস্যরা গুরুদাসপুর থানা লুট করেন। সেসময় সর্বহারার গুলিতে নিহত হন পুলিশের এক সদস্য। ওই হামলার ৩৪ বছর পর ২০২২ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চরমপন্থী বা সর্বহারার এক নেতা গ্রেপ্তার হন। তবে ২০০৪ সালে বাংলা ভাইয়ের ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ নামের একটি সংগঠন সর্বহারা নির্মূলের অভিযান শুরু করে। সেসময় জাগ্রত মুসলিম জনতার কমান্ডার ছিলেন আজিজুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। এরপর থেকে এই অঞ্চলে সর্বহারা সংগঠনের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সারওয়ার হোসেন বলেন, সর্বহারা দাবি করে পাঠানো চিঠির বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা তৎপরাত চলছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা আক্তার বলেন, সর্বহারা দাবি করে একটি দেওয়া হয়েছে। এর আগে এখানে এমন হয়নি। বিষয়টি উর্ধতন কর্তপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। তাছাড়া যৌথ বাহিনীও এই চিঠির ব্যপারে তদন্ত করছে। তিনি স্থানীয়দের আতংকিত না হওয়ার আহবান জানান।