—ছবি মুক্ত প্রভাত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী বছর জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে আগামী বছর। বগুড়া ও গোপালগঞ্জে ৪শ কেভির দুইটি এবং বাঘাবাড়ির ২৩০ কেভির একটি সঞ্চালন লাইন হয়ে এই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
সূত্র বলছে— ২ হাজার ৪শ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সাতটি প্যাকেজে মোট ১হাজার ৯৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ করছে দেশের বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।
এই কাজের প্রায় ৮৬ শতাংশ শেষ করার কথা জানিয়েছেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইভাকুয়েশনের জন্য সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক কিউ এম শফিকুল ইসলাম। কিউ এম শফিকুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জানান, সব মিলিয়ে সঞ্চালন লাইনের কাজ ৮৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। মূলত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে মিল রেখে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। যথা সময়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ শেষ হবে।
তথ্যমতে— ১ হাজার ৯৪ দশমিক ৪১৬ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে দুই ফেজে। এরমধ্যে ৪০০ কেভির সঞ্চালন লাইন রয়েছে ৬৪৮ কিলোমিটার এবং ২৩০ কেভির সঞ্চালন লাইন রয়েছে ৪শ ৪৬ দশমিক ৪১৬ কিলোমিটার।
৪০০ কেভির ৯০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। অবশিষ্ট ৫৫৮ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসের মধ্যে।
এছাড়া ২৩০ কেভির ১৩০ দশমিক ৬২ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের কাজ গত বছরের জুনে শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ৩শ ১৬ দশমিক ৩৫৪ কিলোমিটার কাজ ২০২৪ সালের মার্চে সম্পন্নের আশা করছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড।
পাওয়ার গ্রিড জানিয়েছে— রূপপুর থেকে বাঘাবাড়ী পর্যন্ত ৬৫ দশমিক ৩১ কিলোমিটার ডাবল সার্কিট লাইন, আমিনবাজার থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার, রূপপুর থেকে ঢাকা (আমিনবাজার-কালিয়াকৈর) ১৪৭ কিলোমিটার, রূপপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত ১৪৪ কিলোমিটার, রূপপুর থেকে ধামরাই পর্যন্ত ১৪৫ কিলোমিটার এবং বগুড়া পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হচ্ছে।
এরমধ্যে ২০২৪ সালে পারমাণবিক থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সর্বপ্রথম রূপপুর থেকে বগুড়া ৪০০ কেভি, গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি এবং বাঘাবাড়ি ২৩০ কেভির তিনটি পৃথক সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এজন্য রূপপুর থেকে গোপালগঞ্জের সঞ্চালন লাইনের সাথে পদ্মা নদীতে ৪০০ ও ২৩০ কেভির দুই কিলোমিটার লাইন এবং রিভারক্রসিং নির্মাণ কাজ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ শেষে করে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের উপযোগী করার কথা বলছে পাওয়ার গ্রিড (পিজিসিবি)।
এছাড়া আমিন বাজার, ধামরাই, কালিয়াকৈড় এবং রূপপুর থেকে ঢাকার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ শেষ হবে। একইসাথে যমুনা নদীতে ৪০০ ও ২৩০ কেভির সাত কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ একই সময় শেষ করা হবে। এসব সঞ্চালন লাইনের মধ্যমে ২০২৫ সালে পারমাণবিকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে।
সূত্র বলছে, ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। মোট ১০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকার মধ্যে ঋণের আওতায় ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা দিচ্ছে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। বাকি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ও পিজিসিবি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। এতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ এখন ৩৩তম পরমাণু শক্তি ব্যবহারকারি দেশ
দেশের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন করছে রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিভিইএল ফুয়েল কোম্পানি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৩ সালে রাশিয়া সফরে দেশটির সঙ্গে রূপপুর প্রকল্পের ঋণ চুক্তি সইয়ের পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন (১ম পর্যায়) প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামে। দুটি ইউনিটের মধ্যে প্রথমটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের বিভাগীয় চক্রবর্তী বলেন, জ্বালানি ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের মাধ্যমে পরমাণু শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে বিশ্ব অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করবে বাংলাদেশ।
স্থানীয়দের উচ্ছ্বাস
লাইনটি নির্মাণের সময় তিন জেলার মানুষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এই উচ্ছ্বাসের বহির্প্রকাশ ঘটেছে ইউরেনিয়াম আসার দিন। মহাসড়কের দুই ধারে দাঁড়িয়ে ইউরেনিয়াম বহনকারী গাড়িবহর দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন মানুষ। এছাড়া ৫ অক্টোবরকে ঘিরে রূপপুরে শুরু হয়েছে সাঁজ সাঁজ রব।