তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আত্মঘাতী খেলা
রাজনীতি ডেস্ক: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছিল বিএনপি। ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় দলটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা হিসেবে ৩১ দফা ঘোষণা করা হয়েছিল। অথচ বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের অনেক অমিল দেখা যাচ্ছে। গণভোটের রায় এবং সংবিধান সংস্কারের মূল দাবিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দলটির অবস্থান নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদের লক্ষ্য এবং সংস্কারের জনআকাঙ্ক্ষা পাশ কাটিয়ে দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন কমিটির কার্যক্রমে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ না থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সংশয় দানা বাঁধছে।
সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির বৈঠকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে নতুন কিছু বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করে সেখান থেকে উপরাষ্ট্রপতি বা স্পিকারের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা করা। এছাড়া সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকেই অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান রাখার পরামর্শ এসেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের কথা বলা হচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে এসব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকালীন সরকারের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিতর্ক নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিগত দুই হাজার ছয় সালে বিচারপতি কে এম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সে সময় বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী দলগুলোর কঠোর আন্দোলনের মুখে দেশ এক গভীর সংকটে পড়েছিল। ওই রাজনৈতিক শূন্যতা ও সংঘাতের পথ ধরেই পরবর্তীতে দেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অতীতের সেই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে আবার যদি একগুঁয়েমি দেখানো হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।
বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপি যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়েছিল, বর্তমান ক্ষমতায় থেকেও তাদের সেই আদর্শ বজায় রাখা উচিত। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা কেবল কোনো সাংবিধানিক নিয়ম নয়, এটি দেশের গণতন্ত্র এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই দলীয় সুবিধা হাসিলের চিন্তা বাদ দিয়ে এমন একটি টেকসই ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার যা সব রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায়। এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে রাজনীতিতে নতুন করে অবিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।