নার্সিসিস্টিক অ্যাবিউজের কারণে মস্তিষ্কের যে ধরনের ক্ষতি হয়
স্বাস্থ্য ডেস্ক: মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা একধরনের চলমান মানসিক সংগ্রামের মতো। শুরুর দিকে এই ধরনের সম্পর্ককে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিখুঁত মনে হলেও পরবর্তীতে তা একপর্যায়ে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। এই সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট চক্র রয়েছে যেখানে শুরুতে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসার প্রদর্শন বা লাভ বোম্বিংয়ের মাধ্যমে সঙ্গীকে মোহিত করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে সঙ্গীর পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও চিন্তাভাবনার প্রতিটি ক্ষেত্রে খুঁত ধরতে শুরু করেন ওই ব্যক্তি। সম্পর্কের চালিকাশক্তি কেবল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখাই তাঁদের মূল লক্ষ্য থাকে, যার ফলে ভুক্তভোগী ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
এই ধরনের বিষাক্ত সম্পর্কে দীর্ঘসময় বসবাস করার ফলে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গ্যাসলাইটিং এবং অবমাননার মতো প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের শিকার হলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন এবং কার্যকারিতায় গভীর পরিবর্তন আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ধরনের ধারাবাহিক মানসিক অত্যাচার মস্তিষ্কের ভেতরে এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে যা যেকোনো শারীরিক আঘাতের চেয়ে কোনো অংশেই কম ক্ষতিকর নয়। এর ফলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি চরম মানসিক অবসাদ এবং একধরনের ট্রমা বন্ডের শিকার হন, যেখান থেকে চাইলেও সহজে বেরিয়ে আসতে পারেন না।
নিউরোসায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, নার্সিসিস্টিক নির্যাতনের কারণে মস্তিষ্কের প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। এর মধ্যে স্মৃতিশক্তি ও নতুন তথ্য শেখার দায়িত্বে থাকা হিপোক্যাম্পাস অতিরিক্ত কর্টিসল হরমোনের প্রভাবে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ অ্যামিগডালা সবসময় অতিরিক্ত সক্রিয় থাকার ফলে আকারে বৃদ্ধি পায়, যা ভুক্তভোগীকে সবসময় একটি আতঙ্কিত ও সতর্ক অবস্থার মধ্যে রাখে। এছাড়া বিচারবুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা ও রক্তসঞ্চালন হ্রাস পায়, যার কারণে ভুক্তভোগী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে থাকেন।
মস্তিষ্কের এই ধরনের গাঠনিক পরিবর্তনের ফলে ভুক্তভোগীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিলতা তৈরি হয়। মস্তিষ্কে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে গভীর বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ এবং জটিল পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে আশার কথা হলো, মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি গুণের কারণে নিরাপদ পরিবেশে ফিরে আসা এবং চিকিৎসকদের সঠিক থেরাপির মাধ্যমে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ ধরনের সম্পর্ক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এবং মস্তিষ্কের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত ডায়েরি লিখে রাখা কিংবা আবেগহীনভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।