জাতীয় ডেস্ক: বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পাহাড়ি জনপদ কুরুকপাতা ইউনিয়নে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধিত হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এখনো রয়ে গেছে নানা ধরনের বঞ্চনা। কুরুকপাতা বাজার ও পোয়ামুহুরী এলাকা পর্যন্ত সড়ক নির্মিত হলেও এর পরবর্তী প্রান্তের পাহাড়ি জনপদে এখনো ছড়ায়নি আধুনিকতার আলো। স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রাস্তাঘাট তৈরি হলেও বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো থেকে বঞ্চিত রয়েছে এই এলাকার বাসিন্দারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্গম ইউনিয়নের ১৪২টি পাড়ায় ম্রো, ত্রিপুরা ও মারমাসহ প্রায় এগারো হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। অথচ যুগ পেরিয়ে গেলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার এমন করুণ দশা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনকে প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ করে তুলছে।
সূর্য ডুবলেই পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে অন্ধকারে ডুবে যায়, যার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালাতে হয় কুপি বা কেরোসিনের বাতির ওপর ভরসা করে। সৌরবিদ্যুতের কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যবহার থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চিকিৎসাসেবার বেহাল দশার কারণে গর্ভবতী নারী বা কোনো জরুরি রোগী পড়লে তাদের বাঁচানো নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় স্বজনদের। উপজেলা সদরে পৌঁছাতে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সময় পথেই রোগীদের অবস্থার অবনতি ঘটে। এছাড়া জন্মনিবন্ধনের মতো সাধারণ নাগরিক সেবা গ্রহণ করতেও স্থানীয় দরিদ্র পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ বহন করতে হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের শিশুদের কপালে জুটেছে গভীর অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ। কুরুকপাতা ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর কোমলমতি শিশুদের দূরবর্তী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়, যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেটের অনুপস্থিতি শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে ডিজিটাল সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী ভবন না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় আলীকদম সদর এলাকায় কক্ষ ভাড়া নিয়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে।
এই সার্বিক উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত হয়ে আছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলসংক্রান্ত জটিলতা ও আইনি বাধার দেয়াল। ব্রিটিশ আমলে ঘোষিত মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টের সীমানা ও আইনি অবস্থানের কারণে ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী ভবনসহ বড় কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সনদ পাওয়ার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাহাড়ের এই অবহেলিত জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।