অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের বেসরকারি ব্যাংকখাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এবং পরিচালক পদে একাধিপত্য বা পরিবারতন্ত্রের প্রভাব কমাতে বিগত সময়ে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে, ব্যাংক পরিচালনায় নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের একক নিয়ন্ত্রণ সীমিত করতে এবং পেশাদারিত্ব বাড়াতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের নতুন খসড়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে ব্যাংকখাতের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের আধিপত্য বজায় থাকার পথ উন্মুক্তই থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের একটি বড় অংশের বেসরকারি ব্যাংক হাতে গোনা কয়েকটি প্রভাবশালী পরিবারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে। এর ফলে ঋণ বিতরণ, স্বজনপ্রীতি রোধ এবং ব্যাংকগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অস্বচ্ছতা তৈরি হয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই দৌরাত্ম্য কমিয়ে ব্যাংকিং খাতের ওপর সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা বাড়াতে সংস্কার প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে মত প্রকাশ করেছিলেন অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু নতুন খসড়ায় সেই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ায় জনমনে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তা ও প্রভাবশালী পরিচালকদের চাপের মুখেই মূলত এই নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা কতজন থাকতে পারবে এবং তাদের ক্ষমতার পরিধি কতদূর বিস্তৃত হবে—এসব বিষয়ে পূর্বের কঠোর নিয়মগুলো শিথিল করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকখাতে পরিবারতন্ত্রের যে শেকড় গেড়ে বসেছে, তা থেকে সহজে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংকখাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, অতীতে ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ আত্মসাতের বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে পরিবারতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার কারণে। তাই ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবমুক্ত রাখতে কঠোর আইনের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের এই নমনীয় অবস্থান শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কতটা পেছনের দিকে ঠেলে দেবে, তা নিয়ে এখন থেকেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।