জাতীয় ডেস্ক: আসন্ন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের বিষয়গুলো বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, কাজের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে হয়েছে। মুদ্রণকাজের ধীরগতি, বিদ্যুৎ সংকট এবং নিম্নমানের বই প্রত্যাখ্যান করার মতো ঘটনায় নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত পাঠ্যবই সরবরাহ করা নিয়ে এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতে সব বই হাতে পাবে কি না, তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
পাঠ্যবই ছাপার কাজ চলাকালে প্রাক্কলিত দর ফাঁস হওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় নানা কারচুপির মাধ্যমে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রধান কার্যালয়ে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযানকালে প্রাথমিক প্রাক্কলনের কপি, দাপ্তরিক মূল্যতালিকা এবং বোর্ডের বিশেষ সভার কার্যবিবরণীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করেছে। সংগৃহীত এসব তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কাজ চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানা গেছে, দরপত্র প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা রক্ষা না করে প্রাক্কলিত দর আগেভাগেই ফাঁস করা হয় এবং পরবর্তীতে মুদ্রণশিল্পের মালিকদের অনুরোধে তা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তুলনামূলক বিশ্লেષণে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতে ফর্মাপ্রতি গড় কার্যাদেশের দর আগের তুলনায় বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যক দরপত্রের বিপরীতে মাত্র একটি করে প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের অভাব নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এনসিটিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষেই এই দর সমন্বয় করা হয়েছে।
মুদ্রণের গুণগত মান নিয়েও বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা নিরসনে নীতিনির্ধারকরা মাঠে নেমেছেন। এর আগে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু ছাপাখানা আকস্মিক পরিদর্শন করে কাগজ, কালি ও বাঁধাইয়ের মান স্বচক্ষে যাচাই করেছেন। নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অপরাধে ইতিমধ্যে প্রায় তিন লাখ বই বাতিল করে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও ঘটেছে। এবার প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও অন্যান্য স্তরের জন্য কোটি কোটি কপি বই ছাপানোর বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হলেও বিদ্যুৎ সংকট ও উৎপাদন ঘাটতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় কাটছে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত বই প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, অনিয়মের তদন্ত এবং মুদ্রণ প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত পাঠ্যবই তুলে দেওয়া এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।