ছবিঃ মুক্ত প্রভাত
কখনো বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা, কখনো আবার চারটি তারের মায়াবী সুরে হারিয়ে যাওয়া—এই দুই জগতের মাঝেই বোনা হচ্ছে এক তরুণের স্বপ্ন। এইচএসসি পরীক্ষার ব্যস্ততার ফাঁকেও যখন ছোট্ট একটি ইউকুলেলে তার হাতে ওঠে, তখন চারপাশ যেন বদলে যায়। আঙুলের কোমল স্পর্শে তারে তারে জেগে ওঠে অনুভূতির ভাষা, মনের অজস্র না-বলা গল্প আর স্বপ্নের নীরব সুর। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার এইচএসসি পরীক্ষার্থী শারিয়ান রেজভি শাওনের কাছে ইউকুলেলে কোনো শখের বস্তু নয়; এটি তার আত্মার সঙ্গী, নিঃসঙ্গ বিকেলের আশ্রয় এবং জীবনের গভীরতম ভালোবাসার নাম।
জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার দূরমুঠ ইউনিয়নের হাতিজা গ্রাম তার পৈতৃক নিবাস। তবে শাওনের শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা আর স্বপ্ন দেখার প্রায় পুরো সময়টাই কেটেছে ইসলামপুর উপজেলায়। এখানকার মেঠোপথ, নদীর হাওয়া, স্কুলের মাঠ, বন্ধুদের আড্ডা আর সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাকে গড়ে তুলেছে আজকের শাওনে।
বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ ইসলামপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এর আগে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন ইসলামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরীক্ষার চাপ যতই বাড়ুক, প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় তিনি আলাদা করে রাখেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ইউকুলেলের জন্য। কারণ, তাঁর বিশ্বাস—যে মন সুরের স্পর্শে নির্মল থাকে, সেই মনই সবচেয়ে সুন্দরভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে।
প্রায় চার বছর আগে কৌতূহলবশত ইউকুলেলে হাতে নেওয়া। সেই কৌতূহলই ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর ভালোবাসায়। প্রথমে কর্ড শেখা, তারপর সুরের ভেতর ডুবে যাওয়া, আর আজ ইউকুলেলের প্রতিটি তার যেন তার জীবনেরই এক একটি অধ্যায়। আনন্দ, বিষণ্নতা, অপেক্ষা কিংবা স্বপ্ন—সব অনুভূতিরই ভাষা খুঁজে পান এই ছোট্ট বাদ্যযন্ত্রের সুরে।
এই সংগীতযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রেরণা ও পথপ্রদর্শক তাঁর গুরু সাকিব হোসাইন। গুরুর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল ইউকুলেলের সঙ্গে পরিচয়। আজও প্রতিটি নতুন শেখা সুরে, প্রতিটি সফল পরিবেশনায় তিনি অনুভব করেন গুরুর শিক্ষা, ধৈর্য আর অনুপ্রেরণার ছাপ। শাওনের বিশ্বাস, একজন ভালো শিক্ষক কেবল বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখান না, তিনি একজন শিল্পীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আত্মবিশ্বাসও জাগিয়ে তোলেন।
পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থনও তাঁর পথচলাকে সহজ করেছে। কখনো তাঁরা সংগীতচর্চাকে সময়ের অপচয় ভাবেননি; বরং উৎসাহ দিয়েছেন আরও ভালো করার। বন্ধুদের কাছেও শাওন পরিচিত একজন প্রাণবন্ত তরুণ হিসেবে। আড্ডা কিংবা কোনো ছোট্ট আয়োজন—হাতে ইউকুলেলে উঠলেই যেন বদলে যায় পরিবেশ। পরিচিত গানগুলো নতুন আবহে ফিরে আসে, আর উপস্থিত মানুষের মুখে ফুটে ওঠে হাসি।
আজকের সময়ে যখন অনেক তরুণ সময় হারিয়ে ফেলছে ভার্চুয়াল আসক্তি কিংবা নেতিবাচক অভ্যাসের ভিড়ে, তখন শারিয়ান রেজভি শাওন খুঁজে নিয়েছেন ভিন্ন এক নেশা। তার নেশা সুরের, তার নেশা সৃজনের। চারটি তারের কোমল কম্পনে তিনি খুঁজে পান আত্মবিশ্বাস, মানসিক প্রশান্তি এবং নিজের ভেতরের মানুষটিকে আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার শক্তি।
শাওনের স্বপ্ন শুধু একজন ভালো শিক্ষার্থী হওয়া নয়; একজন ভালো মানুষ এবং একজন দক্ষ ইউকুলেলে শিল্পী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি সংগীতচর্চা অব্যাহত রেখে একদিন নিজের সুরে আরও অনেক মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে চান তিনি।
চারটি তারের ছোট্ট একটি বাদ্যযন্ত্র হয়তো পৃথিবী বদলে দিতে পারে না। কিন্তু সেই চারটি তার যদি কোনো তরুণের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর জীবনের অর্থ হয়ে ওঠে, তবে সেটিই হয়ে উঠতে পারে তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই শক্তির নামই—ইউকুলেলে, আর সেই স্বপ্নবাজ তরুণ—শারিয়ান রেজভি শাওন।
মোঃ সোহাগ আরেফিন