—ছবি মুক্ত প্রভাত
ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ও ভয়াবহ ভাঙন থেকে কুড়িগ্রামের ঐতিহাসিক চিলমারী উপজেলাকে রক্ষার দাবিতে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। শনিবার (১৮ জুলাই, ২০২৬) সকালে চিলমারী উপজেলার প্রত্যন্ত বিশালপাড়া নদীভাঙন এলাকায় এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তীব্র ভাঙনের মুখে পড়া ও ভিটেমাটি হারানো সহস্রাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। সমাবেশ থেকে নদী ভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং দেশের চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের’ আদলে পৃথক ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের জোর দাবি জানানো হয়।
জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবুর সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিলমারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারী সরকার।
এছাড়াও বক্তব্য দেন জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শরীফউদ্দিন আহমেদ রিন্টু, চিলমারী উপজেলা শাখার সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আবু হানিফা, সদস্য সচিব সহকারী অধ্যাপক ফজলুল হক, সোনালী অতীত ফুটবল ক্লাব কুড়িগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদ আলী ঝিনুক, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম কাজী, মহিলা নেত্রী শাহনাজ সুলতানা এবং নদীভাঙনের শিকার সর্বস্ব হারানো আছির উদ্দিন ও শাহজাহান আলীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে প্রতি বছর চিলমারী উপজেলার মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে। বিস্তীর্ণ জনপদ, বাপ-দাদার বসতভিটা, সোনার ফসলিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। অথচ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ বা ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নেই।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু কুড়িগ্রামের নদীভাঙনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলেন, "কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর অন্তত ৪২টি পয়েন্টে বর্তমানে তীব্র নদীভাঙন চলছে। গত ১০ বছরে জেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ তাদের শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তুর মতো নতুন ঠিকানায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান বা ডেটাবেজ সরকারি কোনো দপ্তরের কাছে নেই।"
তিনি আরও বলেন, "বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার মানুষ শুধু জমিজমা হারান না, তারা তাদের শৈশব, স্মৃতি এবং সামাজিক বন্ধনও হারিয়ে ফেলেন। অনেক পরিবার এখনো জানে না, আগামী বন্যায় তারা কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে কিংবা তাদের গবাদিপশু ও সন্তানদের কোথায় নিরাপদ রাখবে।"
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক বেবু বলেন, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, ইংল্যান্ড ও কলম্বিয়ায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের কোনো মানবিক বা কার্যকর নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। তিনি দাবি করেন, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলার দুই কোটিরও বেশি মানুষ নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের নানা সংকটের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি পৃথক 'চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়' গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
সমাবেশ থেকে চিলমারীবাসী নদীভাঙন প্রতিরোধে অনতিবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী বাসস্থান ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং অবহেলিত চরাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানান। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চরের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।