—ছবি সংগৃহিত
উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর মাঠের নান্দনিক মহাকাব্য পেরিয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণে। সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর মাত্র একটি ম্যাচের দূরত্ব। রোববার রাতে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও স্পেন। তবে মাঠের দলগত ট্রফির পাশাপাশি এই মহারণ ঠিক করে দেবে বিশ্বমঞ্চের সেরা ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটগুলো কার মাথায় উঠছে।
ফাইনালের বাঁশি বাজার আগেই পুরস্কারের সমীকরণ ও পরিসংখ্যানের খেরোখাতা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। টুর্নামেন্টের সেরা গোলদাতা, সেরা ফুটবলার কিংবা সেরা গোলরক্ষকের লড়াই এবার যেভাবে জমে উঠেছে, তা সাম্প্রতিককালের ফুটবল ইতিহাসে বিরল।
বুট ও বলের ডাবল মুকুটে ৩৯-এর মেসির চোখ
এবার গোল্ডেন বুটের লড়াইটা সরাসরি রূপ নিয়েছে দুই পিএসজি ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক-বর্তমান সতীর্থের মনস্তাত্ত্বিক দ্বৈরথে। ফাইনালের আগে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে—দুজনেরই গোলসংখ্যা সমান ৮টি। তবে টাইব্রেকারের নিয়মে অ্যাসিস্টের দিক থেকে এগিয়ে আছেন ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। মেসির ৪ অ্যাসিস্টের বিপরীতে এমবাপ্পের ঝুলিতে আছে ৩টি। ফাইনাল ম্যাচে এই দুই মহাতারকার পা থেকে আসা যেকোনো একটি গোল বা অ্যাসিস্টই বদলে দিতে পারে গোল্ডেন বুটের গতিপথ। তাদের ঠিক পেছনেই ৭ গোল নিয়ে ওত পেতে আছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড।
শুধু গোল্ডেন বুটই নয়, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের দৌড়েও সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মেসির সঙ্গে কড়া টক্কর দিচ্ছেন স্পেনের রদ্রি, ওলিভার ওইয়ারসাবাল এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুটি গোল্ডেন বল জেতার রেকর্ড রয়েছে মেসির, এবার সেটি তিন-এ নিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তাঁর সামনে।
পোস্টের নিচে উনাই সিমনের প্রাচীর
সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ কার হাতে উঠবে, তা নিয়ে গুঞ্জন তুঙ্গে। পুরো টুর্নামেন্টে রূপকথার মতো পারফর্ম করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। তাকে দলে নিতে এমএলএসের ক্লাব ইন্টার মায়ামি পর্যন্ত আগ্রহী। তবে কেপ ভার্দে শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়ায় তার সম্ভাবনা কিছুটা ফিকে। অন্যদিকে, ফাইনালিস্ট স্পেনের উনাই সিমন ৭ ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করে এই দৌড়ে বাকিদের চেয়ে বহুদূরে এগিয়ে আছেন। তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারেন ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড কিংবা পর্তুগালের দিওগো কস্তা।
তরুণ তুর্কি ও শৃঙ্খলার লড়াই
অনূর্ধ্ব-২১ বছর বয়সীদের জন্য নির্ধারিত ‘সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়’ পুরস্কারে এবার স্প্যানিশ জয়জয়কার। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের দুই তরুণ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি ফাইনালে ওঠার পাশাপাশি এই পুরস্কারের প্রধান দাবিদার। তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে আছেন ফ্রান্সের দেজিরে দুয়ে এবং মরক্কোর আইয়ুব বুয়াদ্দি। অন্যদিকে, মাঠের সুন্দর আচরণের স্বীকৃতি ‘ফেয়ার প্লে পুরস্কার’ এবারও ইউরোপের কোনো দেশের ঘরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যেখানে দৌড়ে এগিয়ে আছে স্পেন, ফ্রান্স ও নরওয়ে।
ফাইনালের আগেই মিলবে সেরা গোলের হদিস
বিশ্বকাপের সবচেয়ে দর্শনীয় গোলের পুরস্কার ‘গোল অব দ্য টুর্নামেন্ট’ নির্ধারিত হচ্ছে দর্শকদের সরাসরি ভোটে। কোয়ার্টার ও সেমিফাইনাল পর্ব থেকে বাছাই করা সেরা ৬টি গোলের মধ্যে চলছে চূড়ান্ত লড়াই। কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম, হুলিয়ান আলভারেজ এবং এনজো ফার্নান্দেজদের চোখ ধাঁধানো সব গোল রয়েছে এই তালিকায়। নিয়ম অনুযায়ী, ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই দর্শকরা ভোটের মাধ্যমে বেছে নেবেন এবারের বিশ্বকাপের সেরা গোল।
রোববার রাতের ফাইনাল শুধু একটি দলের বিশ্বজয়ের গল্প লিখবে না, বরং এটি হতে যাচ্ছে ব্যক্তিগত কীর্তির এক অনন্য প্রদর্শনী। আলবিসেলেস্তেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশন নাকি স্প্যানিশ আর্মাডার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন—উত্তর মিলবে মাঠের যুদ্ধেই।