—ছবি সংগৃহিত
মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা ভূ-রাজনীতিতে এবার ঘটল এক মহাপরিস্ফুটন। মার্কিন বিমান হামলা ও নৌ-অবরোধের বিপরীতে তেহরানও দিচ্ছে ভয়ানক জবাব। গত কয়েক দিনের চরম উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একযোগে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। আমেরিকার ধারাবাহিক আগ্রাসনের জবাবে ইরানের এই সরাসরি পাল্টা আঘাত পুরো বিশ্বকে এক নতুন সামরিক সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তিন দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন-মিসাইল বৃষ্টি
ইরানের সামরিক কমান্ডের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারির পরই শুরু হয় এই নজিরবিহীন তাণ্ডব।
আঘাত যেখানে যেখানে: জর্ডানের কৌশলগত আজরাক বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের (5th Fleet) সদরদপ্তরকে টার্গেট করে নিখুঁত নিশানা হানে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল।
মার্কিন প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাত: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) আকাশসীমানায় বেশ কিছু ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো আড়ালে রাখা হয়েছে। তবে এর জবাবে আমেরিকার যুদ্ধবিমানগুলো তেহরান ও সেমনান প্রদেশের ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ইরানি ঘাঁটিতে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইরান অভিমুখে যাওয়া সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর কড়া নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী।
‘রেড লাইন’ হরমুজ প্রণালী ও বিশ্ব কাঁপানো জ্বালানি যুদ্ধ
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী তাদের জন্য ‘রেড লাইন’ এবং সেখানে যেকোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের ফলে বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি রুট। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পার হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান যদি এই রুটটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয় কিংবা লোহিত সাগরে তাদের প্রক্সি গ্রুপ ইয়েমেনের হুথিরা যদি বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ তীব্র করে, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে বাধ্য, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ধাক্কায় চরম মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।
প্রক্সি নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা: সংঘাত কি ছড়াবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে?
আমেরিকার সর্বাত্মক হামলার মুখে ইরান এখন তার তাসের টেক্কাগুলো মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিরা ইতিমধ্যে তাদের মিসাইল ইউনিটগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে। হুথিরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী তারা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে এই সংঘাত কেবল ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকজুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অবসান নাকি মহাবিপর্যয়: জল কোন দিকে গড়াবে?
ইতিমধ্যেই পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পক্ষ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার টেবিলে ফেরার জন্য ব্যাকডোর ডিপ্লোমেসি বা গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। কিন্তু মাঠের যে বাস্তবতা, তাতে দুই পক্ষই এখন অহংবোধ ও সামরিক শক্তির চূড়ান্ত প্রদর্শনীতে লিপ্ত।
আমেরিকা যদি ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার নীতিতে অটল থাকে, আর ইরান যদি তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ও তার সহযোগী দেশগুলোর অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি বাস্তবায়ন করে—তবে তা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংকটের জন্ম দেবে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বনেতারা এই বারুদের স্তূপের আগুন নেভাতে পারেন, নাকি এক মহাবিপর্যয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে মানবজাতি।