—ছবি সংগৃহিত
আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামের ঘড়িতে তখন ম্যাচ শেষের অন্তিম মুহূর্ত। ডান প্রান্ত থেকে লিওনেল মেসির বাড়িয়ে দেওয়া নিখুঁত ক্রসটি যখন লাওতারো মার্তিনেজের বুট ছুঁয়ে ইংল্যান্ডের জাল কাঁপিয়ে দিল, তখন শুধু আর্জেন্টিনার গ্যালারিই উল্লাসে ফেটে পড়েনি, বরং ফুটবলবিশ্ব প্রত্যক্ষ করল এক চরম নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প। খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার এই গল্পে মেসি যদি হন প্রধান নায়ক, তবে পার্শ্বনায়ক হিসেবে মার্তিনেজের অবদানও কোনো অংশে কম নয়।
ম্যাচ শেষে যখন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন এই আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার, তখন তার গলা ধরে আসছিল। বারবার গভীর দম নিয়ে আবেগ সামলানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। চোখের কোণে জমা হওয়া জল আর স্মৃতির সরণি বেয়ে উঠে আসছিল এক লড়াকু শৈশবের গল্প, যেখানে জড়িয়ে আছেন তার মা-বাবা।
বাবার বুটজোড়া আর মায়ের বিছানা গুছানোর গল্প
স্বপ্ন পূরণের আনন্দ কেমন হতে পারে, তা মার্তিনেজের ম্যাচ-পরবর্তী কথাগুলোতেই স্পষ্ট। এই মহামঞ্চে দাঁড়িয়ে মার্তিনেজ মনে করলেন তার বাবার কথা। বাবার হাত থেকে পাওয়া সেই প্রথম বুটজোড়া পরেই একদিন আকাশি-নীল জার্সিতে খেলার স্বপ্ন বোনা শুরু করেছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার দক্ষিণের বন্দরনগরী বাইয়া ব্লাঙ্কার এক ফুটবল পরিবারে বেড়ে ওঠা মার্তিনেজের প্রথম ফুটবল শিক্ষকও ছিলেন তার বাবা।
বটবৃক্ষ বাবার পাশাপাশি মার্তিনেজের স্মৃতিতে আবেগের দোলা দিয়েছে স্নেহময়ী মায়ের গল্পও। কৈশোরে রেসিং ক্লাবে খেলার জন্য যখন তিনি বাড়ি ছাড়েন, সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত মা তার বিছানাটি গুছিয়ে রাখেন। মার্তিনেজ আবেগী কণ্ঠে বলেন—
"মায়ের এই ছোট্ট, নিরন্তর ভালোবাসার অভ্যাসটা আমার কাছে যেকোনো গোল বা ফাইনালের চেয়েও অনেক বড়।"
দুঃস্বপ্ন মাড়িয়ে ইন্টার মিলান থেকে কোপা আমেরিকার ট্রফি
মার্তিনেজের ফুটবল ক্যারিয়ারের পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। রেসিং ক্লাবে শুরুর দিনগুলোতে বাড়ির জন্য মন কেমন করত, এমনকি ক্লাব ছেড়ে চলেও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যিস যাননি! সেখান থেকেই নজরে আসেন ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানের। ২০১৮ সালে ইতালিতে পাড়ি জমানোর পর ক্লাবের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং সিরি 'আ'-র সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব জেতেন।
তবে জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে লড়তে হয়েছে ভাগ্যের সাথেও। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল চরম দুঃস্বপ্নের মতো। সৌদি আরবের কাছে হারের পর একাদশে জায়গা হারান হুলিয়ান আলভারেজের কাছে। পুরো টুর্নামেন্টে গোড়ালি চোট নিয়ে খেললেও কোনো অজুহাত দেননি তিনি। বিশ্বকাপ জিতলেও মনে একটা আক্ষেপ রয়ে গিয়েছিল—দলকে তো কিছুই দিতে পারলেন না!
সেই আক্ষেপ ঘুচতে শুরু করে ২০২৪ কোপা আমেরিকায়। ৫ গোল করে গোল্ডেন বুট জেতার পাশাপাশি ফাইনালের জয়সূচক গোলে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি।
লক্ষ্য এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেও মার্তিনেজকে বেশিরভাগ সময় থাকতে হয়েছে বদলি বেঞ্চে। জর্ডানের বিপক্ষে গোল পেলেও, নিজেকে চেনানোর আসল সুযোগ আসে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের গোলে। আর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই সতীর্থ ম্যাক আলিস্টার ও মেদিনাকে বুক ঠুকে বলেছিলেন, এই ম্যাচে তিনি গোল পাবেনই। মাঠের পারফরম্যান্সে সেই কথা রেখেছেন মার্তিনেজ।
মার্তিনেজ খুব ভালো করেই জানেন, কাজটা এখনো শেষ হয়নি। সামনে আরেকটি মেগা ফাইনাল। ফাইনালেও হয়তো শুরু থেকে একাদশে সুযোগ মিলবে না, কিন্তু ইতিহাস গড়তে যে মাত্র একটি জাদুকরী মুহূর্তই যথেষ্ট, তা মার্তিনেজ খুব ভালো করেই জানেন। নিউ জার্সির ফাইনালের মাঠে সেই স্বপ্ন নিয়েই এবার পা রাখবে আর্জেন্টিনার এই 'সুপার সাব'।