—ছবি সংগৃহিত
সময়টা ২০০৭ সালের ডিসেম্বর। বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামের অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমে বসে আছেন ২০ বছরের এক লাজুক আর্জেন্টাইন তরুণ। ফুটবল দুনিয়া তখন রোনালদিনহো, স্যামুয়েল ইতো কিংবা ডেকোদের জাদুতে বুঁদ, আর এই তরুণ কেবল নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করছেন। ঠিক তখনই ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের ফটোশুটের জন্য তাঁর সামনে আনা হলো পাঁচ মাসের এক কৃষ্ণাঙ্গ শিশুকে।
একপাশে লাজুক তরুণ, অন্যপাশে পাঁচ মাসের এক অপরিচিত শিশু। পরিবেশটা ছিল বেশ আড়ষ্ট। কিন্তু প্লাস্টিকের একটা ছোট্ট বাথট্যাবে যখন সেই শিশুকে বসানো হলো, তখন তরুণটি পরম স্নেহে তাকে গোসল করাতে সাহায্য করলেন, তোয়ালে জড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন। স্প্যানিশ ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট ক্যামেরার শাটার চাপলেন—ক্লিক! ইতিহাস তখন ফিসফিস করে হাসছিল, কারণ ক্যামেরার ফ্রেমে থাকা সেই তরুণটি আর কেউ নন, আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী লিওনেল মেসি। আর বাথট্যাবের সেই ফুটফুটে শিশুটি? বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের নতুন বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল!
দীর্ঘ ১৭ বছর এই ছবি ধুলোচাপা পড়ে ছিল বার্সেলোনার আর্কাইভে। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালীন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করতেই তা ইন্টারনেটে টর্নেডো বইয়ে দেয়। ফুটবলপ্রেমীরা চমকে উঠে ভাবছেন—এও কি সম্ভব? নিয়তি বুঝি একেই বলে!
ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, "ছবিটি তোলা মোটেও সহজ ছিল না। এটি ক্যামেরাবন্দি করতে আমাকে রীতিমতো রক্ত পানি করতে হয়েছিল। ফুটবলাররা সাধারণত খুব তাড়াহুড়ো করেন। তবে ইয়ামালের মা শিলা এবানার সহযোগিতা ছাড়া এই ম্যাজিক তৈরি করা সম্ভব হতো না। তাঁর উপস্থিতিতেই শিশুটি স্বাভাবিক ছিল। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি, যা লটারি জেতার মতোই এক বিরল সৌভাগ্য।"
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহর থেকে কোলের শিশুকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে এসেছিলেন ইয়ামালের মা। কষ্ট করে আসার পুরস্কার হিসেবে মনফোর্ট তাঁদের ছবির একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন। কে জানত, সেই উপহারের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের মহাকাব্য!
সেই ঘটনার পর ২০১৪ সালে মাত্র সাড়ে ৬ বছর বয়সে ইয়ামাল যোগ দেন বার্সার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে। এরপর ২০২৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লা লিগায় এবং ১৬ বছর বয়সে স্পেনের জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে তাঁর। ইউরো ২০২৪-এ স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন করার পর, বর্তমানে ক্লাব ফুটবলেও তিনি গায়ে জড়াচ্ছেন মেসির সেই আইকনিক ‘১০ নম্বর’ জার্সি।
মনফোর্ট এই ঘটনার তুলনা করেছেন ১৯৮৬ সালের আরেকটি ঐতিহাসিক ছবির সাথে, যেখানে লা মাসিয়ার ১৫ বছর বয়সী বল বয় পেপ গুয়ার্দিওলা করতালির মাধ্যমে তৎকালীন বিদায়ী কোচ টেরি ভেনাবলসকে বিদায় জানাচ্ছিলেন, যিনি পরে বার্সার সফল ফুটবলার ও কিংবদন্তি কোচ হন।
তবে গল্পের সেরা টুইস্টটি অপেক্ষা করছে আগামী রবিবার মধ্যরাতে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। আর এই ঐতিহাসিক মহারণেই মাঠের লড়াইয়ে প্রথমবার মুখোমুখি হতে চলেছেন একসময়ের সেই ‘ধাই-মা’ মেসি এবং বাথট্যাবের সেই কোলের শিশু ইয়ামাল! ফুটবল বিধাতা হয়তো ১৭ বছর আগেই এই ফাইনালের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন ক্যাম্প ন্যু-এর ড্রেসিংরুমে।