ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করার বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে আটকে গেল বার্ষিক প্রতিরক্ষানীতি-বিষয়ক বিল (এনডিএএ)। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি ডলারের বিশাল সামরিক বাজেটের বড় একটি অংশ অনুমোদনের লক্ষ্যে আনা এই বিলের ওপর বিতর্ক শুরুর প্রস্তাবটি ডেমোক্র্যাটদের আপত্তিতে খারিজ হয়ে গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার সিনেটে বিলটি নিয়ে বিতর্ক শুরু করার পক্ষে ভোটাভুটি হলে তা ৫০-৪৬ ভোটে বাতিল হয়। ১০০ সদস্যের সিনেটে বিতর্ক শুরুর জন্য ন্যূনতম ৬০টি ভোটের প্রয়োজন ছিল। এর ফলে কংগ্রেসে পাস হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বিপক্ষীয় বিল বড় ধরনের ধাক্কা খেল।
যে কারণে ডেমোক্র্যাটদের এই শক্ত অবস্থান
সিনেটে ভোটাভুটির ঠিক আগে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা চাক শুমার দলীয় সদস্যদের বিলটির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। ডেমোক্র্যাটদের আপত্তির মূল কারণগুলো হলো:
ইরান যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ করা: ট্রাম্প প্রশাসন যেন কংগ্রেসের তদারকি বা অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে এককভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ‘ছাড়পত্র’ না পায়, তা নিশ্চিত করা।
ইসরায়েল নীতিতে বিরোধিতা: বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চরমপন্থী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করছেন ডেমোক্র্যাটরা।
রেকর্ড সামরিক বাজেট: পেন্টাগনের জন্য প্রস্তাবিত ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ ও "অস্বাভাবিকভাবে বড়" বাজেট নিয়ে গভীর আপত্তি রয়েছে দলটির।
চিঠিতে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু আঁতাতের কড়া সমালোচনা
গত সপ্তাহে ক্রিস ভ্যান হলেন, বার্নি স্যান্ডার্স, এলিজাবেথ ওয়ারেন ও এড মার্কির মতো শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট সিনেটররা সহকর্মীদের উদ্দেশে একটি যৌথ চিঠি লেখেন। চিঠিতে তাঁরা সাফ জানান, এনডিএএ বিলটিকে কোনোভাবেই বিতর্কের সুযোগ না দিয়ে পাস হতে দেওয়া যাবে না।
সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক ভিডিও বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
"এই বিলটি পেন্টাগনের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করবে, অথচ ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবৈধ যুদ্ধের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না। এর পাশাপাশি ইসরায়েল-সংক্রান্ত বেশ কিছু বিতর্কিত ধারা কোনো আলোচনা ছাড়াই নীরবে এই বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।"
দলীয় অবস্থানে বড় পরিবর্তন এবং যুদ্ধবিরোধী জোটের চাপ
কংগ্রেসের বাইরেও নাগরিক স্বাধীনতা, পররাষ্ট্রনীতি ও যুদ্ধবিরোধী ১৪টি সংগঠনের একটি শক্তিশালী জোট এই বিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে অননুমোদিত যুদ্ধ বন্ধের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত প্রতিরক্ষানীতি বিল এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
এদিকে, ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের এই অবস্থান দলটির ভেতর ইসরায়েল সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলটির ভোটারদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন নাটকীয়ভাবে কমেছে।
জরিপের তথ্য:
রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যেখানে ৫৯ শতাংশ ছিল, তা চলতি বছরের মে মাসে নজিরবিহীনভাবে কমে মাত্র ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের একক নীতির বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের এই অনমনীয় অবস্থান ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের জন্ম দিল।