—ছবি সংগৃহিত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা আবারও এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা ও আইনি সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে—ওয়াশিংটন আবারও ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি সেখানে চলাচলকারী সব জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল আদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত শুক্রবার (১০ জুলাই) মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। এরপর থেকেই বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধক্ষমতা আইনের ফাঁক এবং ট্রাম্পের ‘নতুন ৬০ দিন’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই ট্রাম্পের যুদ্ধ করার ক্ষমতার ওপর লাগাম টানার চেষ্টা করছিল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ। কারণ, ওই হামলার জন্য ট্রাম্প কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন নেননি।
১৯৭৩ সালের মার্কিন ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ (যুদ্ধক্ষমতা আইন) অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান শুরু করলে ৬০ দিন পর প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই সেনা প্রত্যাহার করতে হয়।
তবে গত শুক্রবার পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন:
ইরানের ওপর এই নতুন হামলা ‘দেশে ও বিদেশে মার্কিন নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য’ তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।
হোয়াইট হাউসের দাবি, এই নতুন করে যুদ্ধ ঘোষণার ফলে ট্রাম্প প্রশাসন আইনি জটিলতা এড়িয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরও নতুন করে ৬০ দিনের সময় পেয়ে গেল।
ভেস্তে গেল শান্তি চুক্তি, ভাঙল যুদ্ধবিরতি
এর আগে গত মে মাসে ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন যে, ৭ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ায় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের প্রাথমিক অভিযানটি সমাপ্ত হয়েছে। এমনকি গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
কিন্তু গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ভারতীয় ক্রু নিহত ও ৮ জন আহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যে নতুন করে হামলা শুরু হলে যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুরোপুরি ভেস্তে যায়। এই চুক্তি ভঙ্গের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে দায়ী করছে।
ট্রাম্পের নতুন চাল: হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ অবরোধ
সোমবার (১৩ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অবিশ্বাস্য ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটন এখন হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন:
"যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এখান দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল আদায় করবে। ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে আবারও নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করবে এবং ইরান বা দেশটির গ্রাহকদের কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।"
বিশ্লেষণ: হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সেখানে ২০ শতাংশ কর আরোপের মার্কিন সিদ্ধান্ত কেবল ইরানের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করবে না, বরং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।