—ছবি সংগৃহিত
ইরানের বিরুদ্ধে তীব্র সামরিক সংঘাতের মধ্যেই এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। খোদ মার্কিন সমর বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের সঙ্গে চলমান উচ্চমাত্রার লড়াইয়ের কারণে আমেরিকার প্রধান প্রধান যুদ্ধাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এমন এক সংকটময় সময়ে এই তথ্য সামনে এল, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখন ‘সম্পূর্ণ শেষ’।
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই আশঙ্কা করছেন, এই মিসাইল সংকটের কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো অন্য কোনো পরাশক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধ মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনীর সক্ষমতা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে।
ফাঁকা হচ্ছে পেন্টাগনের অস্ত্রাগার: কোন অস্ত্রের কী দশা?
ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস) এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, গত এপ্রিলের পূর্ণমাত্রার সংঘাতের পর থেকেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)-এর ভাঁড়ারে টান পড়েছে। পরিস্থিতি কতটা আশঙ্কাজনক তা নিচের তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট:
থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা: ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল রুখতে গিয়ে পেন্টাগন তাদের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্তত অনূর্ধ্ব অর্ধেক (৫০%) ব্যবহার করে ফেলেছে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা: আমেরিকার অন্যতম প্রধান এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে ফুরিয়ে গেছে।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার টমাহক ল্যান্ড-অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইলের প্রায় ৩০ শতাংশ ইতিমধ্যে ছুড়ে ফেলা হয়েছে।
চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলন স্পষ্ট করেই বলেছেন, "অস্ত্রের মজুত আমাদের প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।"
নতুন মিসাইল তৈরিতে ধীরগতি: ঘাটতি পূরণে লাগবে ৩ বছর
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং মার্কিন মেরিন কোরের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান জানিয়েছেন, এসব অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও মজুত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির।
টমাহক: পেন্টাগন বর্তমানে প্রতি মাসে মাত্র ১৫টি নতুন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে।
প্যাট্রিয়ট: প্রতি মাসে নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ আসছে মাত্র ২০টি।
থাড: বর্তমান ২০২৬ সালে নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পূর্বানুমান বা শিডিউলই নেই।
সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক অবস্থায় এই অস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে নিতে আমেরিকার অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যাবে। অথচ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণের জন্য মার্কিন কংগ্রেস এখনও পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো ডলার বা বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করেনি।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও ট্রাম্পের জরুরি আইন
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি আগামী কয়েকদিনও বর্তমান হারে ইরানের ওপর হামলা বজায় রাখে, তবে তা আমেরিকার প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করাবে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে প্রতিহত করা কিংবা তাইওয়ান প্রণালিতে চীনের বিরুদ্ধে লড়ার মতো কোনো অস্ত্র আমেরিকার হাতে অবশিষ্ট থাকবে না।
পেন্টাগনের পদক্ষেপ:
সংকট কাটাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে গত জুনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ (প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন) কার্যকর করেছেন। পেন্টাগন দাবি করেছে, তারা মার্কিন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন লাইন বাড়ানোর জন্য বেসরকারি নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি করছে। তবে বিশ্লেষক মার্ক কানসিয়ানের মতে, এই বিশেষ আইন কিছুটা সহায়ক হলেও রাতারাতি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয় এবং এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত।