—ছবি মুক্ত প্রভাত
কাগজে-কলমে বরাদ্দ ১৫০ কেজি গোবর সার, কিন্তু কৃষকের হাতে উঠেছে মাত্র ৪০ কেজির প্যাকেট। আর ৫০ টাকা মূল্যের বাঁশের খুঁটি দেখে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ—এ যেন নড়বড়ে এক আয়োজন। গত ২৯ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মিলনায়তনে কৃষি প্রণোদনা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধনের পর থেকেই জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। অভিযোগ উঠেছে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও নিম্নমানের সামগ্রী বিতরণের।
তবে এই বিতর্কের নেপথ্যে কেবলই কি অনিয়ম, নাকি নতুন কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করতে কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে—তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। ইতিমধ্যেই ঘটনা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। একই সাথে বর্তমান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
১৫০ কেজির ‘গোবর’ যেভাবে ৪০ কেজির ‘কম্পোস্ট’ হলো
অনুসন্ধানে জানা যায়, বরাদ্দের বিবরণীতে কৃষকদের জন্য ১৫০ কেজি গোবর সার দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু বিতরণের সময় কৃষকদের দেওয়া হয় এসিআই কোম্পানির ৪০ কেজির এক প্যাকেট ট্রাইকো কম্পোস্ট সার। কৃষকদের কাছ থেকে ১৫০ কেজি সার গ্রহণের স্বাক্ষর নেওয়ায় প্রথম দিকে মাঠপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ ছড়ায়।
তবে উপজেলা কৃষি অফিসের দাবি, স্থানীয় বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ খোলা গোবর সার পাওয়া অসম্ভব ছিল। ফলে সরকারি বরাদ্দের সমপরিমাণ অর্থ মূল্যের প্যাকেটজাত উন্নতমানের কম্পোস্ট সার কেনা হয়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। উপজেলা কৃষি প্রণোদনা কমিটির রেজুলেশনেও এই পরিবর্তনের লিখিত অনুমোদন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সাধারণ কৃষকদের কাছে ১৫০ কেজির স্থলে ৪০ কেজি পৌঁছানোয় বিষয়টি গণমাধ্যমে ‘ওজন চুরির’ গল্প হিসেবে ডালপালা মেলে।
৫০ টাকার বাঁশের খুঁটি ও ভ্যাট-ঠিকাদারি অঙ্ক
বিতর্কের আরেকটি বড় জায়গা জুড়ে আছে রোপণ করা চারা সুরক্ষার বাঁশের খুঁটি। ৫০ টাকা দরে সরবরাহ করা এই খুঁটিগুলোকে ‘নিম্নমানের’ বলে দাবি করা হয়েছে কিছু প্রতিবেদনে। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, এই সরকারি কেনাকাটার একক কর্তৃত্ব কোনো কর্মকর্তার হাতে ছিল না।
দরপত্র মূল্যায়ন ও ক্রয় কমিটিতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দের ৫০ টাকার মধ্যে ঠিকাদারের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ, সরকারি ভ্যাট ও পরিবহন খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আনুষঙ্গিক ব্যয়গুলো বাদ দিলে মূল খুঁটির পেছনে বরাদ্দ যা থাকে, সেই মানের সামগ্রীই সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু মোট খরচের নেপথ্যের এই হিসাব আড়াল করেই অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।
দুই সপ্তাহের কর্মকর্তা ও ‘সিন্ডিকেট’ তত্ত্ব
পুরো ঘটনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় মোড়টি এসেছে প্রশাসনিক টেবিলে। বর্তমান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ শুভ্র চলতি বছরের ১৬ জুন সাতক্ষীরা সদরে যোগদান করেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তিনি এই নজিরবিহীন বিতর্কের মুখে পড়লেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের একটি বড় অংশের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে এই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক কর্মকর্তা মনির হোসেন। বর্তমান কর্মকর্তা যোগদানের পর সরকারি নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানতে যাওয়ায় স্থানীয় একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়। নতুন কর্মকর্তাকে শুরুতেই মানসিকভাবে কাবু করতে এবং আগের আমলের কোনো অসংগতি তাঁর ঘাড়ে চাপাতেই পরিকল্পিতভাবে এই বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে কিনা, তা এখন টক অব দ্য টাউন।
"যোগদানের পর সরকারি বিধি ও আর্থিক নিয়ম মেনেই সব করা হয়েছে। আমার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়েই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানহানিকর প্রতিবেদন করা হয়েছে। আমি যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্তকে স্বাগত জানাই।"
— মো. আবু সাঈদ শুভ্র, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সাতক্ষীরা সদর।
নিরপেক্ষ তদন্তেই মিলবে সমাধান
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কারণে কোনো উপকরণ পরিবর্তন করা হলে তার কারিগরি যৌক্তিকতা এবং যথাযথ আর্থিক নথিপত্র থাকা বাধ্যতামূলক। কৃষি অফিস যদি নিয়মতান্ত্রিক অনুমোদন নিয়ে থাকে, তবে একে দুর্নীতি বলা চলে না।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যদি সত্যিই কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যদি এটি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হয়ে থাকে, তাও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আপাতত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকেই চেয়ে আছেন সাতক্ষীরার কৃষক ও সচেতন মহল। কাগজের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতার এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত জয় কার হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।