—ছবি সংগৃহিত
কাগজে-কলমে লক্ষ্য ছিল চমৎকার—ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, সূত্রাপুর কিংবা খিলগাঁওয়ের মতো ঘিঞ্জি এলাকাগুলোর রূপ বদলে দেওয়া হবে। পার্ক, খেলার মাঠ, দৃষ্টিনন্দন ঝিল আর আধুনিক নর্দমা নির্মাণের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গাপাড়ের নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বব্যাংকের শত শত কোটি টাকার ঋণসহায়তা পেয়েও স্রেফ ভুল পরিকল্পনা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা আর বারবার সিদ্ধান্ত বদলের বেড়াজালে পড়ে আলোর মুখ দেখেনি ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’।
সাত বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই প্রকল্প পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি। উল্টো অদক্ষতার দায়ে প্রকল্প থেকে বাদ দিতে হয়েছে কামরাঙ্গীরচরের লোহারপুল পুনর্নির্মাণ ও শাহজাহানপুর ঝিল দৃষ্টিনন্দন করার মতো ২৬০ কোটি টাকার দুটি মেগা কাজ!
সমীক্ষা ছাড়াই অনুমানের ওপর প্রকল্প!
নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই প্রকল্পের মূল গলদ ছিল এর শুরুতেই। কোনো পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা কিংবা মাঠপর্যায়ের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই স্রেফ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নকশা তৈরি করা হয়েছিল। ফলে প্রকল্প অনুমোদনের পর যখন কর্মকর্তারা মাঠে যান, তখন দেখা যায় নকশার সাথে বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত। কোথাও জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা, কোথাও আবার স্থানীয়দের চাহিদার সাথে মিল নেই পরিকল্পনার। এই জোড়াতালির ভুল ঠিক করতেই কেটে গেছে বছরের পর বছর।
বিশ্বব্যাংকের নথিতেও ডিএসসিসির এই পদ্ধতিগত দুর্বলতা, ক্রয়ের ধীরগতি এবং মান নিয়ন্ত্রণে অদক্ষতার কথা কঠোর ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণের মাত্র ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ছাড় করতে পেরেছিল ডিএসসিসি, যা বিশ্বব্যাংকের কাছে ‘অসন্তোষজনক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বিশ্বব্যাংকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও অর্থের অপচয়
২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল বাজেট ছিল ৮৮০ কোটি টাকা। কাজ করতে না পারায় তা কাটছাঁট করে ৫০৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। গত জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৫৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যার মধ্যে ৬৮ কোটি টাকাই চলে গেছে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, পরামর্শক ও দাপ্তরিক কেনাকাটায়।
চলতি বছরের ৩১ মে প্রকল্পের দ্বিতীয় দফার বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশ্বব্যাংক সাফ জানিয়ে দিয়েছে—তারা আর সময় বাড়াতে আগ্রহী নয়। ফলে মূল প্রকল্পের অর্থ আর চলমান কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বর্তমানে বাসাবো বালুর মাঠ, লালকুঠি হেরিটেজ ভবন কিংবা ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চের যে আংশিক কাজগুলো চলছে, সেগুলোর বিল মেটাতে হচ্ছে সরকারের নিজস্ব তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের অন্য একটি নতুন প্রকল্প থেকে ধার করে। অর্থাৎ, একই কাজের পেছনে জনগণকে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে।
দায় কার?
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বব্যাংকের মতো বড় সংস্থার অর্থায়নে মেগা প্রকল্প পরিচালনার জন্য যে অভিজ্ঞতা দরকার, শুরুতে দায়িত্ব পাওয়া পরিচালকের তা ছিল না। ফলে জটিলতা বুঝতেই তাঁর দীর্ঘ সময় লেগে যায়। যদিও সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম এর দায় চাপিয়েছেন করোনা মহামারির ওপর।
তবে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক রাজীব খাদেমের দাবি, নানা সীমাবদ্ধতার পরও চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং ইতিমধ্যে ৮৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
মুক্ত প্রভাত মন্তব্য: একটি আধুনিক নগরী গড়ে তোলার পথে এই ধরণের দীর্ঘসূত্রতা স্রেফ অদক্ষতা নয়, বরং জনগণের ট্যাক্সের পয়সার চরম অপচয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের ভাষায়—প্রকল্প ব্যর্থ হলেও সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা হয় না। এই সংস্কৃতি না বদলালে একই ভুল বারবার হতে থাকবে। বিশ্বব্যাংকের টাকা ফেরত যাওয়া এবং বড় প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার পেছনে যাদের গাফিলতি ছিল, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।