—ছবি সংগৃহিত
বিশ্বজুড়ে হাজারো পণ্য রপ্তানি করে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে পরিচিত চীন কেন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল নিতে আগ্রহী—তা নিয়ে দেশীয় বাণিজ্য ও কৃষি মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ইকোনমিসহ মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে, যার অন্যতম একটি হলো বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎপাদিত জাতীয় ফল কাঁঠাল আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের ছাড়পত্র পেল।
রোববার (২৮ জুন) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এই সম্ভাবনাময় কৃষি কূটনীতির আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে চীন বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার কাঁচা আম আমদানি শুরু করেছিল, তখনই তারা কাঁঠাল ও পেয়ারার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখায়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক চীন
বিশ্বব্যাপী কাঁঠালের বাজার এখন শত কোটি ডলারের। ২০১২ সালে বিশ্ববাজারে কাঁঠাল রপ্তানি যেখানে ছিল ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, ২০২৩ সাল নাগাদ তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ কোটি ডলারে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর বিশ্বব্যাপী কাঁঠাল রপ্তানির ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে এককভাবে ভিয়েতনামই দখল করে আছে বৈশ্বিক বাজারের ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, চীন হলো এই কাঁঠালের বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও আমদানিকারক দেশ। তারা তাদের চাহিদার সিংহভাগ ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করে মেটায়।
উৎসবে দ্বিতীয় কিন্তু বিশ্ববাজারে মাত্র ০.৩%
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, দেশে আম ও কলার পর তৃতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদিত ফল হলো কাঁঠাল। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।
এত বিশাল উৎপাদনের পরও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের হার হতাশাজনক—মাত্র ০.৩ শতাংশ। তাও মূলত যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সের ‘এথনিক মার্কেট’ বা প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে (মোট রপ্তানির ৮৫%) এই বাণিজ্য চলে।
৪৫ শতাংশ কাঁঠাল অপচয় রোধের বড় সুযোগ
অভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁঠালের বাণিজ্যিক চাহিদা কম থাকা এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর উৎপাদিত কাঁঠালের ৪৫ শতাংশের বেশি নষ্ট বা অপচয় হয়। চীনের বাজারে রপ্তানির দুয়ার খোলায় এই বিপুল পরিমাণ অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীনের এই বাজার ধরতে পারলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটবে।
রপ্তানির মূল বাধা ও চ্যালেঞ্জসমূহ
সম্ভাবনা বিশাল হলেও চীনের কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী কাঁঠাল রপ্তানি করা বাংলাদেশের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিশেষজ্ঞরা প্রধানত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন:
১. গুণগত মান ও সার্টিফিকেশন: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডীন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, "আমাদের টোটাল কৃষি খাতের রপ্তানি এখনো তেমন ভালো নয়। কোয়ালিটি মেইনটেইন (মান নিয়ন্ত্রণ) না হওয়ায় ইউরোপিয়ান মেইনস্ট্রিম মার্কেটে আমরা এখনো ঢুকতে পারিনি।"
২. সংরক্ষণ ও পরিবহন ঝুঁকি: বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, "কাঁঠাল সংরক্ষণ করা এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি আছে। চীন কাঁচা ফল নাকি প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে নেবে, তা বড় বিষয়।"
৩. অভ্যন্তরীণ পুষ্টির ভারসাম্য: ড. আমিরুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দাম পেলেই সব বাইরে পাঠানো যাবে না। দেশীয় চাহিদা এবং জনগণের নিউট্রিশন বা পুষ্টির দিকটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।"
তবে চ্যালেঞ্জ থাকলেও চীনের সাথে এই সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি (টেকনোলজি) শেখার এবং দেশের মাটিতে কোল্ড চেইন বা প্রসেসিং অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।