—ছবি মুক্ত প্রভাত
ইতালির রাজধানী রোমে প্রবাসী বাংলাদেশি কামাল উদ্দিন বাবুল, তাঁর স্ত্রী ও শিশু কন্যাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় মো. শাহাদাত হোসেন নামে এক বাংলাদেশি যুবককে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে রোম প্রসিকিউটর কার্যালয়। ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে শাহাদাতের ছবি প্রকাশ করার পর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতদের স্বজনরা তাকে শনাক্ত করেছেন।
শনাক্ত হওয়া শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল আহাদের ছেলে এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব বলে স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের পর শাহাদাতের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি রহস্যময় স্ট্যাটাস এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাঁর সম্পৃক্ততার সন্দেহকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নেপথ্যে পরকীয়া সম্পর্ক ও পুরোনো পারিবারিক বিরোধ
নিহত কামাল উদ্দিন বাবুলের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস সুমনের দাবি অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বীজ রোপিত হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই।
ঘনিষ্ঠতা ও পরকীয়া: কামাল উদ্দিন যখন প্রথমদিকে একাই ইতালিতে থাকতেন, তখন দেশে থাকা তাঁর স্ত্রী আরজুর সঙ্গে একই গ্রামের শাহাদাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় একাধিকবার সালিশ-বৈঠকও হয়।
দেশত্যাগ ও ইতালিতে পুনর্বাসন: পারিবারিক অশান্তি এড়াতে প্রায় দুই বছর আগে কামাল তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান। তবে স্বজনদের দাবি, ইতালিতে যাওয়ার পরও আরজুর সঙ্গে শাহাদাতের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এমনকি শাহাদাতকে ইতালিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আরজু নেপথ্যে সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাজ্য থেকে ইতালি যাত্রা: শাহাদাত চার বছর আগে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমালেও সেখানে পারিবারিক বিচ্ছেদ ঘটার পর প্রায় এক বছর আগে তিনি ইতালিতে চলে আসেন।
২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের সেই উড়ো চিঠি
হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারটি গত ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিল। নিহতের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, সে সময় তাদের গ্রামের বাড়িতে একটি অজ্ঞাত বা উঁড়ো চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে মোটা অঙ্কের অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার দাবি করা হয় এবং তা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যাসহ নারীদের ওপর নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
বিষয়টি তখন কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশকে মৌখিকভাবে জানানো হলে পুলিশ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তবে আতঙ্কের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা ইতালিতে ফিরে যান।
হত্যাকাণ্ডের পর ফেসবুকে খুনের আভাস!
রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের ফ্ল্যাটে শুক্রবার রাত ৯টায় এই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং ৫ বছরের কন্যা আরিশা। গুরুতর আহত ছেলে অয়ন (১৮) বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন তাঁর ফেসবুক আইডিতে একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও ভীতিকর স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন:
"একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।"
স্বজনদের মতে, এই পোস্টই প্রমাণ করে শাহাদাত পূর্বপরিকল্পিতভাবে পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছেন।
পরিবার ও রাজনৈতিক দলের বক্তব্য
শনিবার কোম্পানীগঞ্জে শাহাদাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, চার বছর আগে সব সম্পত্তি বিক্রি করে দেশ ছাড়ার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে শাহাদাতের কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁর বড় ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন জানান, দুই মাস আগে তিনি দেশে আসলেও শাহাদাতের সঙ্গে তাঁর কোনো কথা হয়নি।
এদিকে শাহাদাতের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন হায়দার বলেন, "শাহাদাত হোসেন চার বছর আগে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর থেকে দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।"
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, "উড়ো চিঠির মাধ্যমে হুমকির বিষয়টি ভুক্তভোগী পরিবারটি তখন মৌখিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করেছিল।" তবে সুদূর প্রবাসে এসে যে পুরোনো শত্রুতায় পুরো পরিবারকে এভাবে বলী হতে হবে, তা এখন ভাবিয়ে তুলছে নোয়াখালীর স্থানীয় মানুষকে।