—ছবি মুক্ত প্রভাত
প্রায় ৬০ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের সংসারে এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুলকে (৩৯) ঘিরেই ছিল তাঁর সমস্ত স্বপ্ন, নির্ভরতা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন। সুদূর প্রবাসে থাকলেও প্রতিদিন ফোন করে মায়ের খোঁজ নিতেন, আশ্বাস দিতেন দ্রুতই দেশে ফিরে মায়ের পাশে স্থায়ী হবেন। কিন্তু ইতালির রাজধানী রোমে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানসহ খুন হয়েছেন বাবুল।
অথচ নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রামের সেই মায়ের কাছে এখনো পৌঁছায়নি এই নিষ্ঠুর সত্য। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁর একমাত্র ছেলে বেঁচে আছেন, সুস্থ হয়ে একদিন ঠিকই মায়ের কোলে ফিরে আসবেন।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বিজয়নগর এলাকায় নিহত কামাল উদ্দিন বাবুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শোকে স্তব্ধ পুরো বাড়ি। ঘরের ভেতর অনবরত বিলাপ করছেন মা জাহানারা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বারবার বলছেন,
"আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুল কিছু হইবো না।"
মায়ের এমন আকুতি শুনে পাশে থাকা আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃদ্ধা মায়ের আশঙ্কাজনক শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এখনো তাঁকে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বাবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে ইতালির একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
সুখী সংসারের স্বপ্ন ভেঙে দিল ঘাতকের ধারালো অস্ত্র
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে পারিবারিকভাবে মমতাজ বেগম আরজুকে বিয়ে করার পর জীবিকার সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমান কামাল উদ্দিন বাবুল। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক ছেলে অয়ন (১৮) ও এক মেয়ে আরিশাকে নিয়ে ইতালিতে একটি সুখী সংসার গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
কিন্তু গত শুক্রবার (২৬ জুন) ইতালির স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকায় ঘটে যায় এক প্রলয়ংকরী ঘটনা। ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন কামাল উদ্দিন বাবুল, তাঁর স্ত্রী আরজু বেগম এবং তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী অবুজ কন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। এই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তাঁদের বড় ছেলে অয়ন।
নেপথ্যে পুরোনো পারিবারিক বিরোধ ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের দাবি, একই গ্রামের শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীকে কেন্দ্র করে দেশে থাকাকালীন সময় থেকেই একটি পারিবারিক বিরোধ চলছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতেই বাবুল তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান। অন্যদিকে, প্রায় চার বছর আগে শাহাদাত সব সম্পত্তি বিক্রি করে যুক্তরাজ্যে যান এবং পরে পারিবারিক বিচ্ছেদের পর ইতালিতে চলে আসেন।
স্বজনদের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন এই পুরোনো বিরোধের আপস-মীমাংসার উদ্দেশ্যে কামাল উদ্দিন তাঁর পরিবারসহ শাহাদাতের সাথে একটি বৈঠকে বসেন। কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলে শাহাদাত আচমকা ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুরো পরিবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং ছেলে অয়ন প্রাণ বাঁচাতে কোনোমতে পালিয়ে সক্ষম হন।
হত্যার পর ফেসবুকে ঘাতকের স্ট্যাটাস ও পুলিশের তৎপরতা
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন ঘাতক শাহাদাত হোসেন তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ ও রহস্যময় স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন:
"একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।"
শনিবার ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাতের ছবি প্রকাশ করে তাকে এই ট্রিপল মার্ডারের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তার অবস্থান জানতে জনসাধারণের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে সৌদি প্রবাসী শাহাদাতের বড় ভাই ইসমাইল হোসেন হারুন জানান, চার বছর আগে সম্পত্তি বিক্রি করে দেশ ছাড়ার পর থেকে পরিবারের সাথে শাহাদাতের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
এক বছর আগেই এসেছিল হত্যার হুমকি
নিহত কামালের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় এক বছর আগে তাঁর ছেলে যখন বাংলাদেশে এসেছিল, তখন তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বাড়িতে একটি উড়ো চিঠি পাঠানো হয়। বিষয়টি সে সময়ই কোম্পানীগঞ্জ থানাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "তৎকালীন সময়ে ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।"
চরকাঁকড়ার সেই বাড়িটিতে এখন শুধু কান্নার রোল আর অন্তহীন অপেক্ষা। একদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতনিকে হারানোর পাহাড়সম বেদনা, অন্যদিকে অসুস্থ মায়ের অবুঝের মতো পথ চেয়ে থাকা—সব মিলিয়ে এক চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি পরিবারটি। জাহানারা বেগম এখনো অপেক্ষায় আছেন, তাঁর বাবুল হয়তো যেকোনো সময় দরজায় কড়া নেড়ে বলবে, "মা, আমি আইছি।" কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর যে আর কোনোদিন শেষ হবে না, তা কেবল জানেন চারপাশের মানুষগুলো।