—ছবি সংগৃহিত
মাঠে খেলা চলছে, কিন্তু দর্শকের চোখ যেন অন্য কোথাও—সবাই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে বেঞ্চে বসে থাকা এক জাদুকরের দিকে। তিনি লিওনেল মেসি। ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল ম্যাচের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এগুলো রূপকথা হয়ে ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। ডালাসের সকালটাও সাক্ষী হলো তেমনই এক মহাকাব্যিক ইতিহাসের, যেখানে জর্ডানকে ৩–১ গোলে হারিয়ে টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অবিশ্বাস্য এক বিশ্বরেকর্ড গড়লেন লিওনেল মেসি।
গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই তাদের নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলায় শুরুর একাদশে আনা হয়েছিল ৯টি বড় পরিবর্তন। রিজার্ভ বেঞ্চের ফুটবলারদের নিয়ে খেলতে নামলেও ছন্দের কোনো অভাব ছিল না বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
লো সেলসোর বাঁকানো কবিতা ও লাওতারোর ব্যবধান বৃদ্ধি
ম্যাচের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
১৯ মিনিট: বক্সের বাইরে থেকে জিওভান্নি লো সেলসোর বাঁ পায়ের ফ্রি-কিকটি ছিল যেন এক টুকরো নিখুঁত কবিতা। রক্ষণভাগের দেয়াল ফাঁকি দিয়ে বলটি এমনভাবে পোস্টের কোণে জালে জড়ায়, যা গোলরক্ষকের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
পেনাল্টি গোল: প্রথমার্ধেই পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথায় গোল করে ব্যবধান ২–০ করেন লাওতারো মার্তিনেজ।
ইতিমধ্যেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিশ্চিত হওয়া জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচটি তখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা মনে হচ্ছিল।
জর্ডানের পাল্টা আঘাত ও এমির দুর্গ ভাঙন
ফুটবল ম্যাচ কখনোই পুরোপুরি আনুষ্ঠানিকতার বৃত্তে বন্দি থাকে না। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আর্জেন্টিনাকে চমকে দিয়ে পাল্টা আঘাত হানে এশিয়ান পরাশক্তি জর্ডান। তারকা ফরোয়ার্ড মুসা আলতামারির এক দুর্দান্ত শটে পরাস্ত হন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। এবারের বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো গোল হজম করতে হলো এমিকে। ২-১ ব্যবধানে ম্যাচটি যখন জমে উঠেছে, তখনই ডাগআউটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ।
মেসির মাঠে প্রবেশ এবং সেই ‘অনিবার্য’ ফ্রি-কিক
ম্যাচের ৬০ মিনিটের মাথায় বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ান লিওনেল মেসি। মাঠের পাশে চতুর্থ রেফারি যখন তাঁর জার্সি নম্বর তুললেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি রূপ নেয় এক উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে। মাঠে নামলেন শান্ত পায়ে, যেন জানতেন—ইতিহাস আজ তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছে।
৮০ মিনিট: বক্সের বাইরে, প্রায় ২৫ মিটার দূরত্বে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। এই চেনা দৃশ্য ফুটবল বিশ্ব অসংখ্যবার দেখেছে, তবু প্রতিবারই তা নতুন রোমাঞ্চ নিয়ে আসে।
সেই জাদুকরী মুহূর্ত: মেসি শট নিলেন—নিচু, নিখুঁত এবং হিসেবি। জর্ডানের রক্ষণ দেয়াল ফাঁকি দিয়ে গোলকিপার ইয়াজিদ আবুলাইলার ভুল আন্দাজকে বোকা বানিয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে। আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল ৩–১ ব্যবধানে।
ভেঙে গেল ফন্টেইন-জেয়ারজিনহোর রেকর্ড
এই একটি গোলের মাধ্যমেই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একদম একচ্ছত্রভাবে নিজের নাম লিখে নিলেন মেসি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ফুটবলার টানা ৭টি ম্যাচে গোল করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়লেন। এই পথ চলায় তিনি পেছনে ফেলে দিলেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জেয়ারজিনহোর মতো কিংবদন্তিদের।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউটে পা রাখল আর্জেন্টিনা। পরের রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে। তবে এই ৩–১ গোলের জয়টি শুধু ৩ পয়েন্টের হিসাব নয়, এটি ছিল বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার এক বজ্রকণ্ঠ বার্তা। কারণ ইতিহাস শুধু ম্যাচের ফলাফল মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে মুহূর্তকে; আর ডালাসের সকালে মেসির সেই গোলটি ছিল ইতিহাসের পাতায় এক অবিনশ্বর অনিবার্যতার নাম।