—ছবি মুক্ত প্রভাত
নড়াইল-২ (সদরের একাংশ ও লোহাগড়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের (বাচ্চু) সরকারি ‘ঐচ্ছিক তহবিল’ থেকে অনুদান পাওয়ার তালিকায় তাঁর নিজের মেয়ের নামই দুই জায়গায় পাওয়া গেছে। এছাড়া অনুদানভোগীদের সিংহভাগই এমপির নিজের ইউনিয়ন ও তাঁর শ্বশুরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে এমপি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তালিকাটি সঠিক, তবে পুরো দায় চাপিয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিবের (পিএস) ওপর।
সম্প্রতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এমপি আতাউর রহমানের অনুকূলে বরাদ্দকৃত ঐচ্ছিক তহবিলের ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা বিতরণের একটি সরকারি পত্র ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
তালিকার ‘ফাইজা’ রহস্য ও স্বজনপ্রীতি
সচিবালয় থেকে অনুমোদিত ২১ জন অনুদানভোগীর ওই তালিকার ১ ও ৮ নম্বরে রয়েছে ‘ফাইজা’ নামের এক কিশোরী। দুটি নামের বিপরীতে পিতার নাম লেখা হয়েছে যথাক্রমে ‘মো. বাচ্চু’ ও ‘মো. আতাউর’। উভয়ের জন্যই বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার টাকা করে। এই ফাইজা সংসদ সদস্যের নিজের মেয়ে।
শুধু নিজের মেয়েই নয়, তালিকায় চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। দেখা গেছে—নড়াইল সদর উপজেলার ১০ জন অনুদানভোগীর মধ্যে ৯ জনই এমপির নিজের হবখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা। অন্যদিকে, লোহাগড়া উপজেলার ১১ জনের মধ্যে ৭ জনের বাড়ি এমপির শ্বশুরবাড়ি লাহুড়িয়া এলাকায়।
‘সই করা ব্ল্যাঙ্ক প্যাড ঢাকায় ছিল’: এমপির সাফাই
শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে নড়াইল জেলা পরিষদে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের কাছে এই তালিকার সত্যতা নিশ্চিত করেন এমপি আতাউর রহমান। তবে নিজের মেয়ের নাম থাকার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি দাবি করেন, পুরো কাজটি তাঁর পিএস করেছেন।
এমপির ভাষ্যমতে:
"আমি তখন নড়াইলে ছিলাম না। পিএস একদিন বলল জরুরিভিত্তিতে তালিকা দিতে হবে। আমি সব ইউনিয়ন থেকে নাম নিতে বলেছিলাম। কিন্তু সে জানাল—‘অফিস থেকে বলেছে আপাতত যেকোনো একটা তালিকা জমা দিয়ে বরাদ্দ পাস করিয়ে নিতে, পরে এমপি সাহেব নিজের মতো বিতরণ করতে পারবেন।’ ঢাকায় আমার সই করা প্যাড ছিল, পিএস তার চেনাজানাদের নাম দিয়ে তালিকা জমা দিয়ে দিয়েছে। সেই চেনাজানাদের মধ্যে আমার পরিবার ও এলাকার লোক বেশি পড়ে গেছে আরকি।"
তহবিলের টাকা আসার খবরও জানতেন না দাবি করে এমপি আরও বলেন, "ফেসবুকে দেখার পর ইউএনওকে জিজ্ঞেস করে জানলাম টাকা এসেছে। আমি তো এমন না যে সন্তানের নাম দিয়ে ১০ হাজার টাকা নিতে হবে! ওই তালিকা অনুযায়ী টাকা দেওয়া হবে না, আমি আজ ইউএনও সাহেবকে নতুন তালিকা দেব।"
‘নতুন তালিকা নেওয়ার সুযোগ নেই’, স্পষ্ট বার্তা ইউএনওর
এমপি স্থানীয়ভাবে নতুন তালিকা দেওয়ার কথা বললেও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তার কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "এমপির ডিও লেটার অনুযায়ী সচিবালয় যে তালিকা অনুমোদন করেছে, নীতিমালা অনুযায়ী অর্থ কেবল তাদেরই দিতে হবে। এর বাইরে কাউকে টাকা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তালিকায় থাকা কেউ টাকা নিতে না এলে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত যাবে। তালিকা সংশোধন করতে হলে সেটি সচিবালয় থেকেই করে আনতে হবে।"
দরিদ্র ও অসহায় মানুষের আপদকালীন সহায়তার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি তহবিলের তালিকায় খোদ সংসদ সদস্যের মেয়ের নাম এবং এমন নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতিতে নড়াইলের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।