—ছবি সংগৃহিত
খেলার মাঠে শুধু বলের লড়াই নয়, পর্দার আড়ালে চলে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক এবং গোয়েন্দা যুদ্ধ। ব্যোমকেশ, মাসুদ রানা বা জেমস বন্ডের গল্পের মতোই ফুটবল বিশ্বকাপ বা বড় টুর্নামেন্টগুলোতে প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারি করাটা এখন কোচদের কৌশলের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পুরো বিষয়টি কীভাবে ফুটবল দুনিয়াকে প্রভাবিত করছে, তার একটি চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে এখানে:
১. মার্সেলো বিয়েলসা: গোয়েন্দাগিরির ‘ওস্তাদ’
আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসার কাছে প্রতিপক্ষের ওপর নজর রাখাটা বাধ্যতামূলক কর্তব্যের মতো। ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেডের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি প্রতিপক্ষের অনুশীলনের গোপন কৌশল জানতে আক্ষরিক অর্থেই ড্রোন পাঠাতেন। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের ছক পুরোপুরি না জানলে ম্যাচের প্রস্তুতিই অধরা থেকে যায়। অবশ্য এই ড্রোন-কাণ্ডের জন্য লিডসকে বড় অঙ্কের জরিমানাও গুনতে হয়েছিল।
২. কেন এই গোপনীয়তা? ‘ক্লোজড-ডোর’ অনুশীলন
ম্যাচের ভিডিও ফুটেজে সব কৌশল ধরা পড়ে না। তাই দলগুলো তাদের আসল চাল (যেমন: বিশেষ ফ্রি-কিক বা পেনাল্টি শুট-আউটের কৌশল) লুকিয়ে রাখে।
অনুশীলনের প্রথম ১০-১৫ মিনিট (গা গরমের সময়) মিডিয়ার জন্য উন্মুক্ত থাকে।
আসল কৌশল শুরুর আগে ক্যামেরা ও দর্শকদের মাঠ থেকে বের করে দিয়ে ‘রুদ্ধদ্বার’ (Closed-door) অনুশীলন করা হয়।
২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপে লুই ফন হালের নেদারল্যান্ডস দল এভাবেই তাদের চমকপ্রদ সব কৌশল কঠোর নিরাপত্তার আড়ালে ঝালিয়ে নিয়েছিল।
৩. ফিফার কড়া নিয়ম ও ‘নো ফ্লাই জোন’
ফুটবলে অন্য দলের ওপর নজরদারি বা গোয়েন্দাগিরি করা ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিশ্বকাপ ভেন্যু ও অনুশীলনের মাঠগুলোকে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী, মাঠের ওপর বা পাশে ড্রোন ওড়ালে ১ লাখ ডলার জরিমানা এবং ১ বছরের জেলের বিধান রয়েছে।
সম্প্রতি প্রতিপক্ষের ওপর নজর রাখার অপরাধে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ প্লে-অফ থেকে সাউদাম্পটনকে নিষিদ্ধও করা হয়েছে।
৪. ‘আমরা এখন গোয়েন্দাদের যুগে বাস করছি’
নিষেধাজ্ঞা বা জেল-জরিমানার ভয় উপেক্ষা করেও দলগুলো পাহাড়ের চূড়া বা উঁচু ভবন থেকে দূরবীন বা ড্রোনের সাহায্যে নজরদারির চেষ্টা চালায়। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার অনুশীলনে এমন একটি ড্রোন মেক্সিকান সেনাবাহিনী ভূপাতিত করেছে।
পরিস্থিতি এতটাই তীব্র যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো নিজেই অনুশীলনের আগে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পরীক্ষা করেছেন কেউ ওত পেতে আছে কিনা। তাঁর মতে, "আমরা এখন গোয়েন্দাদের যুগে বসবাস করছি।" আবার মার্কিন মিডফিল্ডার টাইলার অ্যাডামসের মতে, কমবেশি সব দলই এই নজরদারির কাজটা করে থাকে।
মূল কথা: দিনশেষে ফুটবল বিশ্বে সবাই হয় নজরদারি করছে, না হয় নজরদারিতে আছে। তবে মাঠের বাইরে ড্রোন বা দূরবীন দিয়ে যতই গোয়েন্দাগিরি করা হোক না কেন, আসল ৯০ মিনিটে মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে এই রোমাঞ্চকর গোয়েন্দাগিরির মূল্য আসলেই শূন্য।