—ছবি সংগৃহিত
মানুষের বয়স আসলে কোথায় জমা হয়? হাঁটুর জোড়ায়? মেরুদণ্ডের হাড়ে? নাকি পুরোনো অ্যালবামের হলদে হয়ে যাওয়া ধূলিধূসরিত ছবিতে?
ডালাসের মায়াবী রাতটা দেখার পর মনে হয়, বয়স বোধ হয় কোথাও জমা হয় না। সে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় কিছু সংখ্যার অবাধ্য বাড়বাড়ন্ত। আর মানুষ যদি কোনো কিছুকে বুক দিয়ে ভালোবাসতে পারে, তবে সেই ভালোবাসার জোরেই সংখ্যার ওই লৌহকপাটকে একসময় হেলায় পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
গত রাতে ডালাসের মাঠে যখন ফুটবলের ইতিহাস লেখা হচ্ছিল, তখন ইতিহাস নিজেই এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। ইতিহাসের একটা চিরন্তন স্বভাব আছে—সে মাঝেমধ্যে তার মূল চরিত্রকে আড়ালে ঠেলে দিয়ে হঠাৎ কোনো এক অচেনা মানুষকে আলোর বৃত্তে এনে দাঁড় করায়। আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়ার ম্যাচে ঠিক সেটাই ঘটলো।
স্কোরবোর্ড যথারীতি বলছিল, এটি লিওনেল মেসির আরও একটি মহিমান্বিত রাত। গোল, রেকর্ড আর বিশ্বকাপের এক নতুন মাইলফলক। মাঠজুড়ে সেই অতি পরিচিত দৃশ্য—প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছে তিনি যেন এক অপার্থিব মরীচিকা। ধরাও যায় না, আবার চোখও ফেরানো যায় না।
ঠিক তেমনই এক জাদুকরী মুহূর্তে সম্প্রচারকদের ক্যামেরা হঠাৎ ঘুরে গেল গ্যালারির দিকে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড! আর তাতেই পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ আটকে গেল এক ফ্রেমে। নীল-সাদা জার্সি পরা এক বৃদ্ধা, হাতে শক্ত করে ধরে আছেন একটি প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা—‘আমার বয়স ১০০ বছর। আমি মেসির ভক্ত।’ ব্যস, এটুকুই! ফুটবলের এই মহোৎসবে মাত্র কয়েকটি শব্দই যেন সব আলো কেড়ে নিল। কারণ, ফুটবল তো কেবল বল আর জালের খেলা নয়; এটি আসলে মানুষের হৃদয়ের, অনুভূতির খেলা।
শতবর্ষী এই চিরসবুজ নারীর নাম পলিন কানা। নেট দুনিয়া অবশ্য তাঁকে ‘গ্র্যানি স্মিথ’ কিংবা ‘গ্যাংস্টার গ্র্যানি’ নামেই চেনে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর এই বাসিন্দা তাঁর নাতি রস স্মিথের সাথে মজার মজার ভিডিও বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় তারকা। কিন্তু ডালাসের গ্যালারিতে তিনি কোনো ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ ছিলেন না। তিনি ছিলেন কেবলই এক শুদ্ধতম অনুরাগী। ফুটবলের অভিধানে এর চেয়ে বড় এবং রাজকীয় পরিচয় আর দ্বিতীয়টি নেই।
আমরা প্রায়ই খেলোয়াড়দের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প শুনি। কিন্তু এই কিংবদন্তিরা আসলে তৈরি হন কোথায়? ট্রফিতে, নাকি রেকর্ডের শুষ্ক পরিসংখ্যানে? সম্ভবত এর কোনোটিই নয়। তাঁরা তৈরি হন এমন সব মানুষের হৃদয়ে, যাঁর জন্ম হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই।
পলিন কানা এক শতাব্দী ধরে এই পৃথিবীর রূপান্তর দেখেছেন। যে পৃথিবীতে টেলিভিশন ছিল সদ্য আবিষ্কৃত এক বিস্ময়, ইন্টারনেট ছিল কল্পবিজ্ঞান—তিনি সেই পৃথিবী থেকে এসেছেন। মহামন্দা, বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত, মানুষের চাঁদে পা রাখা থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল বিপ্লব—সবকিছুর জীবন্ত সাক্ষী তিনি। আর সেই মানুষটিই আজ গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আছেন এক ফুটবলারের জন্য। মেসি এখানে কেবল একজন ফুটবলার নন; তিনি হয়ে উঠেছেন সময়ের এক পরম সেতু, যার এক প্রান্তে স্মার্টফোন হাতে টিকটক প্রজন্ম, আর অন্য প্রান্তে এই শতবর্ষী নারী।
অবশ্য মেসির প্রতি পলিনের এই আদিখ্যেতা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপেও ইন্টার মায়ামির ম্যাচে তাঁর হাতে দেখা গিয়েছিল এক চিলতে প্ল্যাকার্ড—‘মেসি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ কিংবা পিএসজির বিপক্ষে ম্যাচের সেই অমোঘ বাণী—‘মেসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। বয়স তো কেবল একটা সংখ্যা!’
অন্য কেউ হলে হয়তো একে সস্তা প্রচারণার নাটক মনে হতো। কিন্তু পলিনের চোখের চপলতা আর শিশুসুলভ সরলতা একে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ওয়ার্ম-আপের সময় মেসিও দূর থেকে এই ভালোবাসা টের পেয়েছিলেন, হেসে হাত নেড়েছিলেন। সেই ক্ষণিক যোগাযোগের ভাষা কোনো অভিধানে নেই, কোনো লিপিতে নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সংলাপগুলো এভাবেই শব্দহীনতায় লেখা হয়ে যায়।
বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখানো পলিন কানা গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও নাম লিখিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ‘ক্রাউড সার্ফার’ হিসেবে। ৯৯ বছর বয়সে এক কনসার্টে হাজারো মানুষের হাতের ওপর ভেসে ভেসে তিনি যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার দৃশ্য। বার্ধক্যকে তিনি একপাশে সরিয়ে রেখে জীবনকে আলিঙ্গন করেছেন পরম স্বাধীনতায়।
আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে, যেখানে বয়স বাড়লেই মানুষকে ঘরের কোণে চুপচাপ বসে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, সেখানে পলিন কানা এক জীবন্ত বিদ্রোহ। তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, বার্ধক্য কোনো দেওয়াল নয়, বরং জীবনের আরেক আনন্দের নাম। বয়স বাড়লেই কি বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে হবে? প্রিয় কাউকে দেখে গায়ের রক্তে উত্তেজনার ঢেউ তোলা যাবে না?
ডালাসের গ্যালারি আমাদের সেই পরম সত্যটাই মনে করিয়ে দিল। পলিন কানা প্রমাণ করলেন, ফুটবল শেষ পর্যন্ত শুধু গোলের খেলা নয়, এটি মানুষের ভালোবাসার গল্প। আর হৃদয়ে যখন সেই ভালোবাসা খাঁটি হয়, তখন ১০০ বছরও স্রেফ একটা সংখ্যা বৈ কিছু নয়!