—ছবি সংগৃহিত
দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত আর তীব্র কূটনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং কৌশলগত সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রাথমিক চুক্তি ‘সম্পূর্ণভাবে স্বাক্ষরিত’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সের ইভিয়ান-লে-বেঁ-এ জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক দাবি করেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই চুক্তির প্রথম ও বড় প্রভাব হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ আংশিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই নৌপথটি সম্পূর্ণ টোল-মুক্তভাবে খুলে দেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার
বিশ্বের খনিজ তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী বলা হয় হরমুজ প্রণালিকে। বৈশ্বিক খনিজ তেল পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়। গত কয়েক মাস ধরে চলমান সংঘাতের কারণে এই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও তীব্র মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। ট্রাম্পের ‘লেট দ্য অয়েল ফ্লো’ (তেল প্রবাহিত হতে দিন) ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৫ শতাংশ কমে গেছে।
আড়ালে থাকা শর্তাবলি ও তেহরানের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দিলেও, এর সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি, উভয় পক্ষের সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা কিংবা ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে এখনো কিছু ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এই সমঝোতার মূল ভিত্তি হলো ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। পাশাপাশি, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া: মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই একক দাবির পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) চূড়ান্ত হয়েছে। তবে চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়নি। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের উপস্থিতিতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইরান স্পষ্ট করেছে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তারা মাঠপর্যায়ে কোনো শর্ত বাস্তবায়ন শুরু করবে না।
৬০ দিনের সময়সীমা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ
পাকিস্তান ও কাতারের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অর্জিত এই খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৯ জুন আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিন উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে। এই সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবরুদ্ধ ২৫ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল ফেরত দেওয়ার মতো জটিল কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
তবে এই চুক্তিতে লেবানন ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির বিষয়গুলো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো সংশয় রয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে একে বড় কূটনৈতিক বিজয় দাবি করা হলেও, আগামী শুক্রবার জেনেভার আনুষ্ঠানিক টেবিলের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।