—ছবি মুক্ত প্রভাত
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে মো. ফয়েজ উদ্দিন (৪৪) নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ‘মাদকসেবী’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে হত্যার বর্বরোচিত অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত এক স্বঘোষিত মাদক নির্মূল কমিটির বিরুদ্ধে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
আজ শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার নদনা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর শাকতলা গ্রামে এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।
নিহত ফয়েজ উদ্দিন একই এলাকার মো. জামাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি স্থানীয় বাজারে ভ্যানে করে আম, কাঁঠাল ও শাকসবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
কবরস্থানের পাশ থেকে তুলে নিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে উপজেলার নদনা ইউনিয়নের শাকতলা গ্রামের ছিদ্দিকিয়া আলীয়া মাদ্রাসার পেছনে কবরস্থানের পাশ থেকে ফয়েজ উদ্দিন, মো. কিরণ ও মো. আজিজ নামের তিন ব্যক্তিকে আটক করে স্থানীয় ‘স্বঘোষিত মাদক নির্মূল কমিটি’র ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য। এরপর তাদের মাদকসেবী আখ্যা দিয়ে নদনা আছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে নিয়ে আসা হয় এবং লাঠিসোটা দিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় বেধড়ক মারধর করা হয়।
একপর্যায়ে রাত পৌনে ১২টার দিকে উপর্যুপরি পিটুনির চোটে ফয়েজ উদ্দিন গুরুতর আহত হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন বুঝতে পেরে খুনিরা তাঁকে রাস্তার ওপর ফেলে রেখে অপর দুই যুবক কিরণ ও আজিজকে টেনেহিঁচড়ে নদনা ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আটকে রাখে। খবর পেয়ে সোনাইমুড়ী থানা পুলিশ দ্রুত ইউনিয়ন পরিষদে অভিযান চালিয়ে জখম হওয়া কিরণ ও আজিজকে উদ্ধার করে। পরে গ্রাম পুলিশ শফিক উল্লার সহযোগিতায় টহল পুলিশ তাদের চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়।
এদিকে, গুরুতর আহত অবস্থায় ফয়েজ উদ্দিনকে তাঁর স্বজনরা উদ্ধার করে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রথমে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল থেকে মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেলেও পরবর্তীতে পুলিশ খবর পেয়ে বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। সেখানে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
"ছেলের বিচার আল্লাহর দরবারে দিলাম"
বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে নিহতের বৃদ্ধ বাবা জামাল উদ্দিন বলেন, “আমার আর কিছু বলার নেই। আমি আমার ছেলেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা একত্রিত হয়ে হত্যা করেছে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক নির্মূলের নামে মূলত আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
মূল আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান
সোনাইমুড়ী থানার ওসি মো. কবির হোসেন জানান, শুক্রবার দুপুরে নিহতের ছেলে রেজাউল করিম বাদশা বাদী হয়ে সোনাইমুড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ১২ জনকে নামীয় এবং আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তথাকথিত ‘কমিটি’র নামে এভাবে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।