—ছবি মুক্ত প্রভাত
বাবার দুপুরের খাবারটুকু পৌঁছে দিতেই নদীর তীরে ছুটে গিয়েছিল ফুটফুটে শিশু তামিম (৬)। খাবার শেষে বাবা যখন ক্লান্তি দূর করতে নদীর পাড়ে চা পান করছিলেন, তামিম তখন মেতে উঠেছিল খেলায়। কিন্তু সেই খেলাই যে তার জীবনের শেষ খেলা হবে, তা কে জানত! মুহূর্তের অসাবধানতায় মেঘনার উত্তাল স্রোত কেড়ে নিল ছোট্ট তামিমকে। দীর্ঘ ২৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস ও আকুল অপেক্ষা শেষে বুধবার বিকেলে মিলল তার নিথর দেহ।
হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চরচেঙ্গা গ্রাম সংলগ্ন মেঘনা নদীতে। নিহত তামিম ওই গ্রামের স্থানীয় জেলে শাহাদাত হোসেনের ছেলে।
যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা: পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো গত মঙ্গলবারও মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন পেশায় জেলে শাহাদাত হোসেন। দুপুর আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে বাবার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে নদীর তীরে যায় তামিম। খাবার খাওয়া শেষে শাহাদাত হোসেন যখন নদীর পাড়ে চা খাচ্ছিলেন, তখন তামিম তার এক সমবয়সী চাচাতো ভাইয়ের সাথে নদীর তীরে খেলাধুলা করছিল। একপর্যায়ে হঠাৎ করেই সে নদীতে পড়ে গিয়ে স্রোতের টানে তলিয়ে যায়। সাথে থাকা চাচাতো ভাইটি দৌড়ে গিয়ে পরিবারকে খবর দিলে শুরু হয় হাহাকার। স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে নদীতে নেমে দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও তামিমের কোনো সন্ধান পাননি।
দেরিতে উদ্ধার অভিযান ও কোস্টগার্ডের তৎপরতা: নদীপ্রধান অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও হাতিয়ায় ফায়ার সার্ভিস বা কোস্টগার্ডের নিজস্ব কোনো ডুবুরি দল নেই। ফলে দুর্ঘটনার পর পরই পানির নিচে তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ভোলা থেকে বিশেষ ডুবুরি দল এনে বুধবার সকাল থেকে মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালানো হয়। অবশেষে নিখোঁজের ২৮ ঘণ্টা পর, বুধবার বিকেল পৌনে ৬টার দিকে উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের চর আতাউরের দক্ষিণ পাশের মেঘনা নদী থেকে কোস্টগার্ড তামিমের মরদেহ উদ্ধার করে।
প্রশাসনের বক্তব্য: > হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে ডুবুরি দল না থাকায় উদ্ধার কাজ শুরু করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে কোস্টগার্ডের সহায়তায় মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুতই শিশুটির মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বাবার জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া তামিমের এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা-বাবা। নদী পাড়ের মানুষের একটাই দাবি—দুর্ঘটনা কবলিত এই দ্বীপ অঞ্চলে যেন দ্রুত স্থায়ী ডুবুরি দল ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।