—ছবি সংগৃহিত
গতি, আগ্রাসন আর বাউন্স—আধুনিক ক্রিকেটে একজন ফাস্ট বোলারের আসল অস্ত্র যদি এই তিনটি হয়, তবে তার শতভাগ আজ মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে টের পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ৪১ রানে ৪ উইকেট; পরিসংখ্যান হয়তো নাহিদ রানার ক্যারিয়ারের সেরা নয়, কারণ ১২ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এর আগেও দুবার ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি আছে তার। কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম যখন অস্ট্রেলিয়া, তখন এই ৪ উইকেটের মাহাত্ম্য ৫ উইকেটের চেয়েও বেশি কিছু।
প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড, ট্রাভিস হেড বা মিচেল মার্শরা এই সিরিজে আসেননি ঠিকই, কিন্তু মারনাস লাবুশেন, জশ ইংলিস, অ্যালেক্স ক্যারি, ম্যাথু শর্ট কিংবা অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিনদের নিয়ে গড়া এই অস্ট্রেলিয়া দলকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকেই আজ স্রেফ গতি আর আগ্রাসনে কাঁপিয়ে দিলেন বাংলাদেশের নতুন ‘স্পিড স্টার’।
ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া স্পেল ও উইকেটের টাইমিং
নাহিদ রানা আজ শুধু উইকেট নেননি, ব্রেক-থ্রু এনে দিয়েছেন ঠিক যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল:
জশ ইংলিস (১৯ রান): ২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে টেনে তুলছিলেন অধিনায়ক জশ ইংলিস ও কনোলি। ৪৯ রানের বিপজ্জনক জুটি ভাঙতে নাহিদ রানা ছোড়েন ঘণ্টায় ১৪৮ কিলোমিটার গতির এক গোলা। থিতু হওয়া ইংলিস পরাস্ত হন সেই গতিতে।
অ্যালেক্স ক্যারি (৪৭ রান): ৯১ রানে ৪ উইকেট পড়ার পর ক্যামেরন গ্রিনকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়েন অভিজ্ঞ অ্যালেক্স ক্যারি। ৪৭ রান করে ফিফটির দিকে এগোতে থাকা ক্যারিকে থামান নাহিদ রানা। এবার বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার।
লোয়ার অর্ডার ধস: এরপর নিজের দ্বিতীয় স্পেলে এসে টানা দুই ওভারে লিয়াম স্কট ও পেসার জাভিয়ের বার্টলেটকে দুটি বিষাক্ত বাউন্সারে কুপোকাত করেন রানা। তার এই স্পেলটাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
শুরুর নড়বড়ে অবস্থা থেকে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
আজ নাহিদ রানার শুরুটা কিন্তু আদর্শ ফাস্ট বোলারের মতো ছিল না। গতি থাকলেও লাইন-লেন্থে কিছুটা নড়বড়ে ছিলেন।
প্রথম স্পেল: ৪ ওভারে খরচ করেন ২১ রান।
পরের স্পেল: পরের ৬ ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়ে তুলে নেন ৪ উইকেট (যদিও নবম ওভারে ১১ রান দিয়েছিলেন)।
শুরুর ধাক্কা সামলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে একজন তরুণ বোলারের এভাবে ফিরে আসাটাই প্রমাণ করে তার মানসিক শক্তিমত্তা।
১৫০+ কিমি গতি আর 'অস্ট্রেলিয়ান' আগ্রাসন
আজকের বোলিংয়ে নাহিদ রানার গতির প্রদর্শন ছিল চোখ ধাঁধানো। পুরো ১০ ওভারের কোটায় শেষদিকে মাত্র ৩টি স্লোয়ার বাদে বাকিটা সময় শুধু আগুনের গোলা ছুড়েছেন।
গতির ঝড়: দুবার পার করেছেন ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতির মাইলফলক। আর যে ৪টি উইকেট পেয়েছেন, তার প্রতিটিরই গতি ছিল কমপক্ষে ১৪৬ কিলোমিটার!
বডি ল্যাঙ্গুয়েজ: শুধু গতি নয়, আজ রানার শরীরী ভাষা ছিল দেখার মতো। অজি অধিনায়ক ইংলিসকে আউট করার পর যেভাবে তেড়ে গিয়ে উদ্যাপন করলেন, তা বাংলাদেশ ক্রিকেটে সচরাচর দেখা যায় না। স্লেজিং আর বাউন্সারে অস্ট্রেলিয়ানদের তাদেরই চেনা আগ্রাসনের স্বাদ ফিরিয়ে দিলেন রানা।
বেচারা লিটন দাস! > নাহিদ রানা যখন উইকেটে আগুনের গোলা ছুড়ছিলেন, তখন উইকেটের পেছনে পরীক্ষা দিতে হয়েছে লিটন দাসকেও। ব্যাটসম্যানরা বল মিস করলেই তা রকেটের গতিতে আঘাত করছিল লিটনের গ্লাভসে। ক্যাচ ধরার চেয়ে গ্লাভস বাঁচানোই যেন দায় ছিল উইকেটকিপারের!
২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক ওয়ানডে জয়ের দিনে স্পটলাইট কেড়ে নিলেন ২২ বছর বয়সী নাহিদ রানা। গতি আর আগ্রাসনের এই ধারা বজায় থাকলে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, তা বলাই বাহুল্য।