—ছবি সংগৃহিত
জাতীয় সংসদে আজ মঙ্গলবার ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা নিয়ে এক উত্তপ্ত বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের আনা একটি নোটিশের জবাবে কারও নাম সরাসরি উল্লেখ না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "একবার দখল করা ব্যাংক বেদখল হয়ে যাবে—তার যে যাতনা হচ্ছে, সেটা তাঁরা বুঝতে পারছেন।"
ইসলামের দোহাই দিয়ে ব্যাংকিং খাতে রাজনীতিকীকরণ এবং বিগত ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন অনিয়মের এক দীর্ঘ খতিয়ান আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের সামনে তুলে ধরেন।
‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়’
সংসদে বিরোধী দলের আনা নোটিশের তীব্র সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "এখন বলা হচ্ছে আপনারা ব্যাংকের মালিক না। জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না। আবার বলছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক তো ইসলাম নয়। আমাদের জনাব ফখরুল ইসলাম যেমন ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়।"
অতীতে ব্যাংকটি দখলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "একবার যেই ব্যাংক আজান দিয়ে, তকবিরে লিল্লাহ দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে যাবে। এই যাতনা তো আমরা বুঝি মাননীয় স্পিকার।"
৫ আগস্টের পর ২২ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও নির্বাচনী তহবিল!
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে কী পরিমাণ অনিয়ম হয়েছে, তার একটি চাঞ্চল্যকর তালিকা সংসদে পেশ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ:
ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্টের নামে অর্থ লুট: ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগের ১১ হাজার কোটির পর, ৫ আগস্টের পর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
নাবিল গ্রুপের এলসি জালিয়াতি: ৫ আগস্টের পর নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকার এলসি ঋণ দেওয়া হলেও মালামাল বিক্রি করে সেই টাকা আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত করে বলেন, "দুষ্টু লোকেরা বলে, সেটা কোনো এক দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে।" বর্তমানে এই গ্রুপের ব্যাংক লায়াবিলিটি (দেনা) ১৬ হাজার কোটি টাকা, যার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে।
বিমানের টিকিটও সিএসআর ফান্ডে: প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচনের আগে একটি বিশেষ গ্রুপকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এমনকি করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির (সিএসআর) নাম করে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট পর্যন্ত ব্যাংক থেকে করানো হয়েছে।
৯ হাজার কর্মকর্তা ছাঁটাই, তকবির দিয়ে নতুন দলীয় নিয়োগ
ব্যাংকের জনবল কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার অভিযোগ এনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তকবির দিয়ে ব্যাংক দখল করার পর কোনো নিয়ম-কানুন না মেনে ৯ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ৬ হাজার নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে রাতারাতি ৩টি করে প্রমোশন দিয়ে ১৩ হাজার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন, "এই অনিয়মগুলো তো হয়েছে মাননীয় স্পিকার, ইসলামের নামেই হয়েছে বলে মনে হয়। তদন্ত হলে অনেকের নাম চলে আসবে।"
‘শেয়ারহোল্ডার ইজ শেয়ারহোল্ডার’, অর্থ পাচারের তদন্তের দাবি
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ডাকাতি হয়েছে—বিরোধী দলের এমন অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেয়ারহোল্ডাররা কীভাবে শেয়ার কিনেছে তা দুদক তদন্ত করতে পারে, তবে ‘শেয়ারহোল্ডার ইজ শেয়ারহোল্ডার’। ইবনে সিনা তাদের ২ শতাংশ শেয়ার ব্লক মার্কেটে ৩ গুণ দামে বিক্রি করেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমানে একটি গ্রুপের হাতেই ৮১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বৈধ ও প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সাথে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে লাখ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আমরা দাবি করছি মাননীয় স্পিকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে সব অর্থ পাচারের তদন্ত করা হোক। যারা মানুষের টাকা বিদেশে পাচার করেছে, সবার বিচার হোক।"
বক্তব্যের শেষে ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত বা চলমান নেই। তবে নতুন কোনো অভিযোগ এলে তা অবশ্যই তদন্ত করা হবে।