—ছবি সংগৃহিত
ভোরের প্রথম আলো যেমন সব অন্ধকার দূর করে এক নতুন দিনের বার্তা আনে, মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ক্রিকেটও যেন আজ তেমনই এক ‘মুক্ত প্রভাত’ দেখল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৮৬ রানের এই জয় কেবল একটা ম্যাচের জয় নয়; এ যেন দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান, একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন ক্রিকেটীয় সূর্যোদয়। কার্ডিফের সেই রূপকথার পর তাসের ঘরের মতো কেটে গেছে দুটি দশক। আজ মিরপুরে অস্ট্রেলীয় অহমিকা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে বাঘের বাচ্চারা জানান দিল— দিন বদলেছে।
শান্ত-তানজিদের ভিত, মোসাদ্দেকের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
টসে হেরে শুরুতে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই সাইফ হাসানের উইকেট হারিয়ে যখন মেঘ জমছিল বাংলাদেশের আকাশে, তখনই হাল ধরেন তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্ত। দুজনের ৯৬ রানের ধ্রুপদী জুটি দলকে বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখায়। তানজিদ খেলেন ৪৪ বলে ৫৪ রানের এক ঝড়ো ইনিংস, আর শান্তর ব্যাট থেকে আসে ৮৬ বলে ৬৭ রান।
মাঝপথে হুট করে ৩ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন ব্যাকফুটে, তখনই উইকেটে আসেন মোসাদ্দেক হোসেন। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা এই অলরাউন্ডার আজ খেললেন এক মহামূল্যবান ইনিংস। অজি ফিল্ডারদের দেওয়া চারটি জীবনদানের পুরো ফায়দা তুলে ৭০ বলে ৮৫ রানের (৭ চার ও ৩ ছক্কা) এক টর্নেডো ইনিংস খেলেন তিনি। মেহেদী মিরাজের ফিফটি আর তাওহিদ হৃদয়ের লড়াইয়ে ভর করে বাংলাদেশ পায় ৮ উইকেটে ২৮৪ রানের এক পাহাড়সম পুঁজি।
তাসকিনের শুরু, মোস্তাফিজের আঘাত
২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতেই খাঁচায় বন্দি করার বন্দোবস্ত করেন তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের প্রথম বলেই অফস্টাম্পের বাইরের মরণকামড় দেওয়া এক ইনসুইঙ্গারে ম্যাথু শর্টের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন তিনি। শর্ট যখন অবিশ্বাসের চোখে ড্রেসিংরুমের পথ ধরছেন, মিরপুরের গ্যালারিতে তখন উৎসবের আমেজ। পরের ওভারেই মার্নাস লাবুশেনকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান। মাত্র ২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই কোমর ভেঙে যায় অজিদের।
নাহিদ রানা: গতির আগুনে পুড়ল অজি অহংকার
তবে আজকের মুক্ত প্রভাতের আসল নায়ক একজনই— নাহিদ রানা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন গতির ঝড় আর আগুনে বাউন্স এর আগে খুব কমই দেখা গেছে। প্রতিটা বল যেন ছিল এক একটি অগ্নিগোলক, যা আছড়ে পড়ছিল ১৪০ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি গতিতে।
কুপার কনোলি আর জশ ইংলিস যখনই প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছিলেন, তখনই বল হাতে রুখে দাঁড়ান নাহিদ। ইংলিসকে (১৯) উইকেটরক্ষক লিটন দাসের ক্যাচ বানিয়ে যেভাবে তিনি তেড়ে গেলেন এবং তপ্ত বাক্যবিনিময় করলেন, তাতেই স্পষ্ট— এই নতুন বাংলাদেশ আর কাউকে সমীহ করে চলে না। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই সেট ব্যাটার অ্যালেক্স ক্যারিকেও (৪৭) ফেরান নাহিদ। ৪১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে আজ অজি মিডল অর্ডারকে একাই ধ্বংস করেছেন এই গতিদানব।
ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট: ক্যামেরন গ্রিনের ৫২ রানের ইনিংস আর আধঘণ্টার বৃষ্টি কেবল অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়ের মুহূর্তটাকে কিছুটা পিছিয়ে দিতে পেরেছিল, কিন্তু ভাগ্য বদলাতে পারেনি। বল হাতেও মোসাদ্দেক ২ উইকেট নিলে অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
অস্ট্রেলিয়ার এই দলটি দ্বিতীয় সারির কি না, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হতেই পারে। তবে ২১ বছর পর ক্যাঙ্গারুদের হারিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে নতুন ভোরের সূচনা হলো, তা এক বুক তাজা অক্সিজেন জোগাবে নিশ্চিত। মিরপুরের আকাশে আজ যে লাল-সবুজের পতাকা উড়ছে, তা যেন এক 'মুক্ত প্রভাতের'ই প্রতিচ্ছবি।