—ছবি সংগৃহিত
দীর্ঘ এক দশক পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁদের হদিস পেতে এবং গ্রেপ্তার করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’-এর রেড নোটিশ জারির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার (৮ জুন) বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (১) আদালতের বিচারক মুমিনুল হক এই আদেশ দেন। কুমিল্লা আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ আদেশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
কাঠগড়ায় সাবেক দুই সেনাসদস্য
আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন—তৎকালীন কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ (৪৮) এবং ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সাবেক সৈনিক শাহীন আলম (৩৭)। বর্তমানে তাঁরা দুজনেই সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আছেন বা তাঁদের অবসরে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলার শুরু থেকেই তনুর পরিবারের অভিযোগ ছিল—এই হত্যাকাণ্ডের মূল নেতৃত্বে ছিলেন সার্জেন্ট জাহিদ। তাঁর বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। অন্যদিকে, অপর আসামি সৈনিক শাহীন আলমের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচংয়ে। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এর আগে, পিবিআই-এর (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম আদালতে সন্দেহভাজন এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা ও রেড নোটিশের আবেদন জানান। পাশাপাশি তনু হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোনো তদন্ত প্রতিবেদন থাকলে, তাও হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়।
ডিএনএ পরীক্ষায় চাঞ্চল্যকর নতুন মোড়
দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকার পর সম্প্রতি পিবিআই-এর তদন্তে গতি আসায় বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অতি সম্প্রতি ডিএনএ পরীক্ষার নতুন রিপোর্টে জানা গেছে, তনুর পোশাকে আগের তিনজনের শুক্রাণুর (স্পার্ম) পাশাপাশি এবার চতুর্থ আরেক ব্যক্তির রক্তের নমুনা পাওয়া গেছে। এই নতুন ডিএনএ প্রোফাইলটি খুনিদের শনাক্ত করতে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে তদন্ত সংস্থা।
কারাগারে সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর
এদিকে এই মামলায় এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে (৫২) আজ কড়া নিরাপত্তায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে পিবিআই তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। আজ আদালতে তাঁর পক্ষে কোনো জামিন আবেদন না করায় বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মেয়ের অবর্ণনীয় হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ১০ বছর পর একজন খুনিকে কাঠগড়ায় দেখে তনুর বাবা ইয়ার আলী গণমাধ্যমে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, "চোখে শান্তি লাগছে।"
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছের একটি ঝোপঝাড় থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বিচারহীনতার অন্ধকারে থাকা এই মামলাটি এখন পিবিআই-এর হাত ধরে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে।