—ছবি সংগৃহিত
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবং অনুমিত ছক মেনেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ২১তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলামের বোর্ডকে অপসারণের পর গঠিত ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁর অধীনেই গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সম্পন্ন হলো বিসিবি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা। আগামী চার বছরের জন্য এখন দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাটন তাঁরই হাতে।
অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিসিবির এবারের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনও শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। কাউন্সিলর মনোনয়ন থেকে শুরু করে পদের বণ্টন—সবই হয়েছে সুনির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী।
একপেশে নির্বাচন ও ভোটের সমীকরণ
বিসিবি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচনটি মূলত ছিল আংশিক পদের জন্য। ২৫ জন পরিচালকের মধ্যে সিংহভাগই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলেন ভোটের আগে।
ক্যাটাগরি-১ (জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা): ১০ পরিচালকের মধ্যে ৭ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। শুধু খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বরিশাল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ফরচুন বরিশালের মালিক মিজানুর রহমান। খুলনা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন শফিকুল আলম ও শান্তনু ইসলাম।
ক্যাটাগরি-২ (ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব): ১২টি পরিচালক পদের বিপরীতে লড়াই করেন ১৬ জন প্রার্থী। এই শ্রেণিতে ওল্ড ডিওএইচএসের কাউন্সিলর হিসেবে সর্বোচ্চ ৭৩ ভোট পেয়ে রেকর্ড গড়েন তামিম ইকবাল। এই ক্যাটাগরিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ১২তম পদের জন্য। ৪১ ভোট পেয়ে শেষ পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হন সরকার মাহবুব আহমেদ, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সৈয়দ বোরহানুল হোসেন মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে (৪০ ভোট) হেরে যান।
ক্যাটাগরি-৩: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আছেন।
‘বাপের দোয়া’ ক্রিকেট বোর্ড প্রসঙ্গে তামিমের জবাব
বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের সন্তানদের বোর্ডে আধিক্য থাকায় জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এই অ্যাডহক কমিটির নাম দিয়েছিলেন ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’। এই আলোচিত ট্যাগটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব মহলে মুখে মুখে।
গতকাল ফল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নবনির্বাচিত সভাপতি তামিম ইকবাল কিছুটা বিব্রতকর হাসি হেসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জবাব দেন:
"অনেকে অনেক ধরনের ট্যাগ দিচ্ছে, এটা অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত মত। দেখি, বাপের দোয়া থেকে ক্রিকেটের দোয়া করতে পারি কি পারি না ভবিষ্যতে।"
পরিচয় ছাপিয়ে মূল লক্ষ্য ক্রিকেট—এমন বার্তা দিয়ে তামিম তাঁর বোর্ড পরিচালকদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলেন, "আপনাদের ব্যক্তিগত পরিচয় যা–ই থাকুক না কেন, আমাদের দায়িত্ব একটাই; আর ওটা হলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেবা করা, একে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।" তিনি আরও যোগ করেন, গত এক-দেড় বছরে দেশের ক্রিকেটের যে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করাই হবে তাঁর প্রথম কাজ।
গঠনতন্ত্রের সংস্কার ও হাইপারফরম্যান্স (HP) সেন্টারের নতুন স্বপ্ন
সাবেক আমিনুল ইসলাম বোর্ডের নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) সুপারিশ করা গঠনতান্ত্রিক সংস্কারগুলো এবারের নির্বাচনে কেন মানা হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে তামিম জানান, বিসিবির আগামী সাধারণ পরিষদে (AGM) আলোচনা করে এই সংস্কারগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে নিজের স্বপ্নের প্রকল্প হিসেবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হাইপারফরম্যান্স (HP) সেন্টার গঠনের ঘোষণা দেন তামিম। এর আগে পূর্বাচলে শেখ হাসিনা ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও এইচপি সেন্টারের নকশা করেছিল অস্ট্রেলিয়ার পপুলাস নামক একটি বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান, যার জন্য বিসিবি বিপুল অর্থও পরিশোধ করেছে। তবে সেই নকশা পছন্দ হয়নি নতুন সভাপতির। পপুলাসকে পুনরায় ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে জানিয়ে তামিম বলেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে নকশা পরিবর্তন করে দ্রুতই হাইপারফরম্যান্স সেন্টারের কাজ শুরু করা হবে এবং এ ব্যাপারে তিনি সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।