—ছবি সংগৃহিত
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার সম্প্রচারস্বত্ব কেনা নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বড় আর্থিক অনিয়মের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। ফিফা থেকে সরাসরি স্বত্ব না কিনে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভায়া হয়ে খেলা দেখানোর কারণে সে সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ২৫ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ‘তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’ নামের এক বিতর্কিত ঠিকাদারি সংস্থাকে ৯৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল।
অথচ চলতি বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব ফিফা থেকে সরাসরি কিনেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। এতে সরকারের মোট খরচ হচ্ছে ৭৩ কোটি টাকা—যা ২০২২ সালের চেয়ে ২৫ কোটি টাকা কম। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় আজ এই প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
হাতবদলের ‘মহানাটক’ ও সাংবাদিকদের কাছে তথ্য গোপন
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র চার দিন আগে (১৬ নভেম্বর) তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে তমা কনস্ট্রাকশন থেকে স্বত্ব কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। তবে অনিয়ম ঢাকতে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এই তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল।
তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদের পাঠানো প্রস্তাবে দেখা যায়, ফিফা থেকে বিটিভি পর্যন্ত এই স্বত্ব আসতে রীতিমতো হাতবদলের ‘মহানাটক’ সাজানো হয়েছিল। প্রথমে ফিফা থেকে স্বত্ব কেনে ভায়াকম ১৮ ইন্ডিয়া। তাদের কাছ থেকে এভিমোর পিটিই লিমিটেড, তাদের হাত ঘুরে নরওয়েস্টার ওমর কে স্পোর্ট জয়েন্টভেঞ্চার এবং সর্বশেষ চতুর্থ পক্ষ হিসেবে যুক্ত হয় তমা কনস্ট্রাকশন।
মূলত সড়ক ও অবকাঠামো খাতের ঠিকাদারি করা তমা কনস্ট্রাকশন কেন হঠাৎ করে খেলাধুলার সম্প্রচার ব্যবসায় নামল, তা নিয়ে সে সময়ই প্রশ্ন উঠেছিল। তমার কর্ণধার আতাউর রহমান ভূঁইয়া ওরফে মানিক নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই যে এই অবাস্তব চেইন তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন স্পষ্ট।
অর্থ বিভাগের নির্দেশনা উপেক্ষা ও তমার চাপ
নথি অনুযায়ী, এই ক্রয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অর্থ বিভাগ জানিয়েছিল, ‘অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা’ খাত থেকে বিটিভিকে সর্বোচ্চ ৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা দেওয়া যেতে পারে। বাকি টাকা স্পনসর ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তুলতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে বিনিয়োগের পুরো টাকা যাতে সরকারি রাজস্বে ফেরত আসে, তা নিশ্চিতের তাগিদ দেওয়া হয়।
কিন্তু তৎকালীন বিটিভি কর্তৃপক্ষ অর্থ বিভাগের সেই নির্দেশনাকে বুড়ো আঙুল দেখায়। বিটিভির তৎকালীন মহাপরিচালক সোহরাব হোসেন দাবি করেছিলেন, তমা কনস্ট্রাকশন ৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় স্বত্ব দিতে রাজি হয়নি। হাতে ‘পর্যাপ্ত সময় নেই’—এমন অজুহাত দেখিয়ে স্পনসর খোঁজার কোনো চেষ্টা না করেই তমার চাহিদামতো ৯৮ কোটি টাকার চুক্তি চূড়ান্ত করে বিটিভি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তড়িঘড়ি করে এই সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেছিলেন।
শেষ রক্ষা হয়নি রাজনৈতিক ঠিকাদারের
সে সময় তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান মানিক দাবি করেছিলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ী, যেখানে ব্যবসা আছে সেখানেই যাই। ৯৮ কোটি টাকা মোটেও বেশি নয়।’ তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই দুর্নীতির থলে উন্মোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক হওয়া এই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশে ২০২৩ সালের এপ্রিলে তাঁর বিদেশযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালের বিটিভির এই ‘ক্রয়’ ছিল স্রেফ রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও দলীয় ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার একটি কুৎসিত দৃষ্টান্ত। চলতি বছরের সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণের টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।