-ছবি সংগৃহীত
ইউক্রেন যুদ্ধের বারুদ এবার আছড়ে পড়ল সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত দেশ রোমানিয়ার মাটিতে। আজ শুক্রবার ভোরে ইউক্রেন সীমান্ত লাগোয়া রোমানিয়ার গালাতি শহরের একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রাশিয়ার একটি ড্রোন সরাসরি আঘাত হেনেছে। এতে ভবনটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায় এবং ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর ও ৫৩ বছর বয়সী এক নারী গুরুতর আহত হন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর রোমানিয়ার ভূখণ্ডে ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা বহুবার ঘটলেও, কোনো বেসামরিক আবাসিক ভবনে সরাসরি রুশ ড্রোনের আঘাত হানার ঘটনা এটিই প্রথম।
এই নজিরবিহীন ঘটনার পর পূর্ব ইউরোপে চরম সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
‘সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা’: প্রেসিডেন্ট নিকুসন ড্যান
ড্রোন হামলার এই ঘটনাকে ২০২২ সালের পর ‘রোমানিয়ার ভূখণ্ডে হওয়া সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকুসন ড্যান। হামলার পরপরই তিনি জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। একই সঙ্গে রোমানিয়া সরকার বুখারেস্টে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ ও জবাবদিহি দাবি করেছে।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৮ ও ২৯ মে মধ্যরাতে ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালায় রাশিয়া। সেই হামলার সময় একটি ড্রোন রোমানিয়ার নৌ-সীমার আকাশসীমা লঙ্ঘন করে গালাতি শহরের দক্ষিণ অংশ পর্যন্ত চলে আসে এবং রাডারে শনাক্ত হয়। ড্রোনটিকে প্রতিহত করতে রোমানিয়া তাৎক্ষণিকভাবে দুটি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন (F-16) যুদ্ধবিমান মোতায়েন করলেও শেষ রক্ষা হয়নি; ড্রোনটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ছাদে বিধ্বস্ত হয়।
‘প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষা করা হবে’: ন্যাটোর হুঁশিয়ারি
রোমানিয়ার ওপর এই হামলার ঘটনাকে মস্কোর ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ আচরণ বলে আখ্যা দিয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জরুরি ফোনালাপ শেষে ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন:
“রাশিয়ার এই বেপরোয়া আচরণ আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক। আমি রোমানিয়াকে পূর্ণ সমর্থনের অঙ্গীকার করছি এবং নিশ্চিত করছি যে, মিত্র জোটের প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষা করার জন্য ন্যাটো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।”
এদিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন এই হামলাকে রাশিয়ার আগ্রাসনের ‘আরও একটি সীমারেখা অতিক্রম’ বলে বর্ণনা করেছেন। রোমানিয়ার জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ব সীমান্তে এবার প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও চাপ আরও জোরদার করা হবে।
প্রতিবেশীদের উদ্বেগ ও জাপোরিঝঝিয়ায় হামলা
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ নোয়েল বারো এই ঘটনাকে রাশিয়ার ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, রোমানিয়া ও ইউক্রেনের মাঝখানে অবস্থিত মলদোভার প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু রাশিয়াকে ‘সবার জন্য বিপজ্জনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, এর আগে মলদোভাতেও একাধিকবার রুশ ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনা ঘটেছিল।
এদিকে, ইউক্রেনের আশপাশের এলাকায় সম্ভাব্য রুশ হামলার আশঙ্কায় গত রাতভর দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কতা জারি ছিল। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একই রাতে ইউক্রেনের দক্ষিণে জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলেও রুশ বাহিনীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত দুজন বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। রোমানিয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের আগুন ক্রমশ ন্যাটোভুক্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে।