ছবি সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ অবশেষে কিছুটা নামতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বৃদ্ধি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে একটি নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। আন্তর্জাতিক এই ইতিবাচক খবরের জের ধরে বিশ্ববাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। আজ শুক্রবার বিশ্বের প্রধান প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যার ফলে চলতি সপ্তাহজুড়েই মার্কিন মুদ্রার দর পতনের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই চুক্তির আওতায় আগামী দুই মাস যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। তবে এই সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনা সমান্তরালভাবে চলতে থাকবে।
তেলের বাজারে স্বস্তি, নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা হ্রাস
যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির এই খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা কমে এসেছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের অনিশ্চয়তার মেঘ কাটতে শুরু করেছে। সাধারণত যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে বিনিয়োগকারীরা সোনা বা মার্কিন ডলারের মতো ‘নিরাপদ আশ্রয়ে’ (Safe-haven) অর্থ বিনিয়োগ করতে পছন্দ করেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বরফ গলতে শুরু করায় ডলারের সেই কৃত্রিম চাহিদা কমে গেছে।
আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ইউবিএস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বৈশ্বিক বাজার কৌশল বিভাগের প্রধান মাসিমিলিয়ানো কাস্তেল্লি এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট যদি পুরোপুরি কেটে যায়, তবে মার্কিন ডলারের এই দুর্বল ভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অনেক বড় বিনিয়োগকারী এখন ডলারভিত্তিক সম্পদ বা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে বিনিয়োগ বহুমুখীকরণের কথা ভাবছেন।”
বিশ্ব মুদ্রাবাজারে কার অবস্থান কেমন?
আজ শুক্রবার এশিয়ার মুদ্রা লেনদেন বাজারে ডলারের বিপরীতে অন্যান্য প্রধান প্রধান মুদ্রাগুলো বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে:
-
ইউরো ও পাউন্ড: ইউরোর দর সামান্য বেড়ে $১.১৬৫৩$ ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ পাউন্ড $১.৩৪৪৫$ ডলারে প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে।
-
নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলীয় ডলার: নিউজিল্যান্ড ডলার আজ প্রায় $০.২\%$ বৃদ্ধি পেয়ে $০.৫৯৪৬$ ডলারে উঠেছে, যা গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি অস্ট্রেলীয় ডলারের মান ছিল $০.৭১৬৪$ ডলার।
-
জাপানি ইয়েন: ডলারের দুর্বলতার সরাসরি সুবিধা পেয়েছে জাপানি ইয়েন। প্রতি ডলারে এখন পাওয়া যাচ্ছে $১৫৯.২৭$ ইয়েন। এর ফলে মনস্তাত্ত্বিক সীমা ১৬০ ইয়েন থেকে বাজার কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে সরে এসেছে, যা জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য স্বস্তিদায়ক।
ডলার ইনডেক্সে টানা দুই সপ্তাহের উত্থানে ছেদ
বিশ্বের প্রধান ছয়টি শক্তিশালী মুদ্রার বিপরীতে ডলারের গড় মান নির্ধারণকারী ‘ডলার ইনডেক্স’ বা ডলার সূচক আজ ৯৮.৯৯৭ পয়েন্টে এসে স্থবির হয়ে পড়েছে। আগের দিনই এই সূচকটি ০.২% কমেছিল। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত টানা দুই সপ্তাহ ধরে ডলারের যে জয়জয়কার চলছিল, এই সমঝোতার খবরে চলতি সপ্তাহে তা প্রায় ০.৩% পতনের মুখ দেখতে যাচ্ছে।
এদিকে, ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। গত এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ আপাতত তাদের ঋণের সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে বাধ্য হতে পারে, যা ডলারে আরও মন্দাভাব ডেকে আনতে পারে।