—ছবি সংগৃহিত
দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম উত্তেজনা আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে বরফ গলতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক টেবিলে। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির আভাস দিয়েছে ইরান। তবে এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তির আশায় উল্লসিত হতে বারণ করেছে তেহরান। গত সোমবার (২৫ মে) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে জানান, "বেশিরভাগ বিষয়ে আমরা একটা সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছি। তবে তার মানে এই নয় যে এখনই কোনো চুক্তি সই হতে যাচ্ছে।"
কী আছে সম্ভাব্য এই খসড়া কাঠামোয়?
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দাবি, দুই পক্ষের টেবিলে থাকা প্রস্তাবটি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নয়, বরং একটি অন্তর্বর্তীকালীন খসড়া ফ্রেমওয়ার্ক। এর আওতায় প্রাথমিকভাবে তিনটি মূল বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে:
১. চলমান ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানো।
২. বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করা।
৩. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি করা।
পরবর্তী ধাপে তেহরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের মতো জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে দরকষাকষি হবে বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পের ‘ধীরে চলো’ নীতি ও রুবিওর সতর্কতা
এদিকে নতুন মার্কিন প্রশাসন এই আলোচনা নিয়ে বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। নয়াদিল্লিতে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, তিনি আশা করেছিলেন সোমবারের মধ্যেই হয়তো বড় কোনো ঘোষণা আসবে। তবে অতি-উত্সাহের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, "ইরানের দিক থেকে চূড়ান্ত সাড়া পেতে কিছুটা সময় লাগছে।"
অন্যদিকে, আলোচনার গতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও কোনো তাড়াহুড়ো করতে রাজি নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) বা গণমাধ্যমে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, "আলোচনা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। তবে আমি আমার টিমকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি—চুক্তির জন্য তাড়াহুড়ো করার কোনো প্রয়োজন নেই। সময় এখন আমাদের পক্ষে।"
স্বস্তির নিঃশ্বাস বিশ্ববাজারে
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি (LNG) সরবরাহ হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ইরান এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে আগুন লেগে যায়। তবে সোমবার দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা কমে এসেছে। একই সাথে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে দেখা গেছে চাঙ্গা ভাব, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তির খবর।
ঘরেই তোপের মুখে ট্রাম্প
বাইরের দুনিয়ায় এই আলোচনার ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও, ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ। কট্টরপন্থী রিপাবলিকান নেতারা মনে করছেন, ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন নমনীয়তার পরিচয় দিচ্ছে।
মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ এই সম্ভাব্য সমঝোতাকে একটি ‘ভয়ানক ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আবার ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি দেওয়ার মানে হলো, আমাদের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত সাফল্যকে পানিতে ফেলে দেওয়া।" ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেননি। তাঁর চাঁছাছোলা প্রশ্ন—"ইরানকে যদি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী অবস্থানেই রেখে দেওয়া হয়, তবে এই যুদ্ধ আমরা শুরুই বা করতে গেলাম কেন?"