—ছবি সংগৃহিত
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আসছে নতুন বেতনকাঠামো, যা আগামী ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে সরকারের নতুন এই কাঠামো এককালীন না দিয়ে তিনটি অর্থবছরে মোট তিন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বাজেট-সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই কর্মপরিকল্পনায় নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা ও বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
যেভাবে তিন ধাপে বেতন বাড়বে (উদাহরণসহ)
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম দুই বছর শুধু মূল বেতন (Basic) ধাপে ধাপে দেওয়া হবে এবং শেষ বছরে গিয়ে ভাতা কার্যকর হবে।
ধরা যাক, একজন কর্মকর্তা বর্তমানে মূল বেতন পান ৫০,০০০ টাকা। নতুন কাঠামোতে তাঁর মূল বেতন নির্ধারিত হলো ১,০০,০০০ টাকা (অর্থাৎ বেতন বেড়েছে ৫০,০০০ টাকা)।
১ম বছর (জুলাই ২০২৬): বর্ধিত বেতনের ৫০% দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ওই কর্মকর্তা মূল বেতন পাবেন ৭৫,০০০ টাকা (৫0,০০০+২৫,০০০)। ভাতা আগের নিয়মেই থাকবে।
২য় বছর (জুলাই ২০২৭): নতুন কাঠামোর পুরো মূল বেতন অর্থাৎ ১,০০,০০০ টাকা পাবেন। ভাতা আগের নিয়মেই থাকবে।
৩য় বছর (জুলাই ২০২৮): ১ লাখ টাকা মূল বেতনের পাশাপাশি নতুন কাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য সব ভাতা ও সুবিধা দেওয়া শুরু হবে।
নতুন বেতনকাঠামোর প্রধান সুপারিশসমূহ
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত জানুয়ারি মাসে এই প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের মূল সুপারিশগুলো হলো:
১. বেতন বৃদ্ধি ও গ্রেড
প্রস্তাবিত কাঠামোতে গ্রেড আগের মতোই ২০টি থাকছে, তবে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে ১০০% থেকে ১৪০%।
সর্বনিম্ন বেতন: ৮,২৫ো টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব।
সর্বোচ্চ বেতন: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত) করার প্রস্তাব।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য ২০টি ধাপের বাইরে অর্থ বিভাগ আলাদা একটি বিশেষ ধাপ তৈরি করবে।
২. ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা
বৈশাখী ভাতা: বর্তমান মূল বেতনের ২০% থেকে বাড়িয়ে ৫০% করার সুপারিশ।
যাতায়াত ভাতা: আগে এটি ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পেতেন। এবার তা বাড়িয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাড়িভাড়া: কম বেতনভোগীদের (১১-২০তম গ্রেড) বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি এবং উচ্চ পদস্থদের (১-১০ম গ্রেড) ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
পেনশনভোগীদের সুবিধাও বাড়ছে
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও শতভাগের বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে:
মাসে ২০,০০০ টাকার কম পেনশন পান: তাঁদের পেনশন ১০০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।
মাসে ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা পেনশন পান: তাঁদের পেনশন ৭৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
মাসে ৪০,০০০ টাকার বেশি পেনশন পান: তাঁদের পেনশন বাড়তে পারে ৫৫% পর্যন্ত।
চিকিৎসা ভাতা (বয়সভিত্তিক সুপারিশ):
৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য: ১০,০০০ টাকা
৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য: ৮,০০০ টাকা
৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য: ৫,০০০ টাকা
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বাজেট বরাদ্দ
বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন কমিশন ঘোষিত প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন।
তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রথম বছর (আগামী অর্থবছর) সরকারের অতিরিক্ত মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুর্বল রাজস্ব আদায়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সরকার আগামী ১ জুলাই থেকেই এটি কার্যকর করতে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী ২১ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির পরবর্তী বৈঠক থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা আসবে।