—ছবি সংগৃহিত
চার দিনের কৌশলগত চীন সফর শেষ করে ওয়াশিংটনে ফিরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশে ফিরেই তাঁর নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও তেহরানের দিকে। ইরান পরিস্থিতি নিয়ে হোয়াইট হাউজে যেকোনো সময় বড় ধরনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। পেন্টাগনের শীর্ষ উপদেষ্টারা ইতিমধ্যেই নতুন করে সামরিক অভিযানের ছক তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে তেহরানের ওপর আরও জোরালো বিমান হামলার ইঙ্গিত রয়েছে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের অনমনীয় বার্তা
বেইজিং ছাড়ার পরপরই শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বহনকারী বিশেষ বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ট্রাম্প। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ইরানের পক্ষ থেকে আসা সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি তাঁর কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ট্রাম্প বলেন—
"আমি প্রস্তাবটি দেখেছি। কোনো প্রস্তাবের প্রথম বাক্যটিই যদি আমার পছন্দ না হয়, তবে আমি তা সরাসরি ছুড়ে ফেলি।"
তিনি আরও জানান, সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ইরানের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে। তবে তেহরানের অন্যতম কৌশলগত ও জ্বালানি অংশীদার চীনের ওপর তিনি নতুন করে কোনো চাপ সৃষ্টির অনুরোধ করেননি।
পেন্টাগনের টেবিলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’
গত মাসে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর বন্ধ থাকা মার্কিন সামরিক তৎপরতা আবারও সচল করার জোর প্রস্তুতি চলছে পেন্টাগনে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই সামরিক পরিকল্পনাটি নতুন কোনো নামে আগামী দিনগুলোতে মাঠে গড়াতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আইনপ্রণেতাদের কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, "প্রয়োজন হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও তীব্র করার সব পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আর যদি পরিস্থিতি অনুকূলে আসে, তবে সেখানে মোতায়েন অতিরিক্ত ৫০ হাজারের বেশি সেনাকে স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হবে।"
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করেছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোগুলোতে সম্ভাব্য বিমান হামলার জন্য যৌথ প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
বিকল্প ভাবনায় বিশেষ কমান্ডো অভিযান
পেন্টাগন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু বিমান হামলাই নয়, মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখা ইরানের পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করতে স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স (বিশেষ কমান্ডো বাহিনী) নামানোর বিকল্পও ট্রাম্পের টেবিলে রাখা হয়েছে।
প্রধান লক্ষ্যবস্তু: বিশেষায়িত পদাতিক সেনাদের মূলত ইরানের ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লক্ষ্য করে অভিযানে ব্যবহার করা হতে পারে।
খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ: ইরানি তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখলের পরিকল্পনাও মার্কিন সেনাদের বিবেচনায় রয়েছে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন, এই ধরনের স্থল অভিযানে মার্কিন ও ইরানি সেনাদের সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানির বড় ঝুঁকি রয়েছে।
‘আমরা সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত’: ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধংদেহী অবস্থানের বিপরীতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরানও। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে লিখেছেন—
"যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভুল কৌশল ও ভুল সিদ্ধান্ত সব সময় ভুল ফলাফল বয়ে আনে। পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যেই তা বুঝতে পেরেছে। আমরা সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত; তারা বিস্মিত হবে।"
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, পূর্বের ক্ষয়ক্ষতির ধকল কাটিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালি বরাবর তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিরই কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে, যা এই সংকীর্ণ জলপথে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও আন্তর্জাতিক তেল ট্যাংকার চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প আলোচনার টেবিলে সমঝোতায় আসেন নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন এক বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।