—ছবি সংগৃহিত
দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডির মাটিতে যে গর্জন তুলেছিল টাইগাররা, তার প্রতিধ্বনি আজ শুনল মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। গতির ঝড়, স্পিনের মায়াজাল আর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর প্রখর বুদ্ধিমত্তায় পাকিস্তানকে সিরিজের প্রথম টেস্টে ১০৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। ১০৪ রানের এই জয় কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের টেস্ট আভিজাত্যের নতুন এক ঘোষণা।
লক্ষ্য যখন হিমালয় সমান
চতুর্থ ইনিংসে ২৬৮ রানের লক্ষ্য মিরপুরের ঘূর্ণি উইকেটে সবসময়ই পাহাড়সম। কিন্তু জয়টা যে বাংলাদেশ ছিনিয়ে নিতেই মাঠে নেমেছে, তার প্রমাণ মিলেছে পঞ্চম দিনের শুরু থেকেই। সকালে ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারালেও দ্রুত ৮৮ রান যোগ করে ৯ উইকেটে ২৪০ রানে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। অধিনায়ক শান্তর ৮৭ রানের লড়াকু ইনিংস পাকিস্তানকে জয়ের লক্ষ্য থেকে ক্রমশ দূরে ঠেলে দিচ্ছিল।
তাসকিন-মিরাজ ও তাইজুলের সম্মিলিত আঘাত
লাঞ্চের মিনিট বিশেক আগে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হয় পাকিস্তানকে। ইনিংসের প্রথম ওভারেই তাসকিন আহমেদের বলে কট বিহাইন্ড হয়ে ফিরে যান ইমাম-উল হক। লাঞ্চের পর নিজের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করা আজান আওয়াইসকে বোল্ড করে বিপদে ফেলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর তাইজুলের ঘূর্ণিতে একে একে সাজঘরে ফেরেন থিতু হতে চাওয়া আবদুল্লাহ ফজল। কিন্তু নাটকের আসল অঙ্কটা তখনও বাকি ছিল।
নাহিদ রানা: মিরপুরে গতির তাণ্ডব
যখনই মনে হচ্ছিল পাকিস্তান হয়তো ম্যাচটি ড্রয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাবে, তখনই মঞ্চে আবির্ভূত হন গতির জাদুকর নাহিদ রানা। ১৪৭ কিলোমিটার গতির একেকটি বল যেন তখন গ্যালারিতে বসা দর্শকদের জন্য ছিল আতশবাজি, আর পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের জন্য আগুনের গোলা।
ম্যাচের হাইলাইটস হয়ে থাকবে মোহাম্মদ রিজওয়ানের সেই বোল্ড হওয়া। নাহিদ রানার ভেতরে ঢুকে আসা একটি দ্রুতগতির বল যেন রিজওয়ান দেখতেই পাননি; যখন দেখলেন, ততক্ষণে অফ-স্টাম্পের বেলস উড়ছে কয়েক গজ দূরে। রিজওয়ান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। নিজের টানা তিন ওভারে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের ভাগ্য একাই গড়ে দেন এই তরুণ পেসার। শাহিন আফ্রিদিকে শেষ উইকেট হিসেবে আউট করে ইনিংসে নিজের ৫ উইকেট (পাঞ্জা) পূর্ণ করেন নাহিদ।
অধিনায়কের বিচক্ষণতা ও ঐতিহাসিক জয়
পুরো ম্যাচে আলাদা করে বলতে হয় নাজমুল হোসেন শান্তর নাম। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৭ রান করে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বোলারদের রোটেট করা, ফিল্ডিং সাজানো আর সঠিক সময়ে ইনিংস ঘোষণা—সব মিলিয়ে শান্তর অধিনায়কত্ব ছিল নিখুঁত।
স্কোরবোর্ড এক নজরে:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪১৩/১০
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৩৮৬/১০
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ২৪০/৯ (ডি.)
পাকিস্তান ২য় ইনিংস: ১৬৩/১০ (লক্ষ্য ছিল ২৬৮)
ফলাফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।
ম্যাচ বিশ্লেষণ:
বাংলাদেশের এই জয়ের পেছনে মূল কারিগর ছিল পেস এবং স্পিনের ভারসাম্য। একদিকে তাসকিন ও নাহিদ রানার গতি, অন্যদিকে তাইজুল ও মিরাজের নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে পাকিস্তান কোনো পর্যায়েই ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। ৮ মে ২০২৬ দিনটি তাই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে খোদাই হয়ে থাকবে গতির জয়গান হিসেবে।