স্বাধীনতা পরবর্তী এই দীর্ঘ সময়েও উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পশ্চিমের গ্রামগুলোর সাথে উপজেলা সদরের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি।—ছবি মুক্ত প্রভাত
প্রসব ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন আতিয়া বেগম (২৪)। ভ্যানে করে হাসপাতালের নেওয়ার পথে চিৎকার করছিলেন। বৃষ্টির রাতে বেতকান্দির কাঁচা সড়কের কাদায় বার বার আটকে যায় ভ্যানের চাকা। ব্যথা বাড়ায় পথেই প্রসবের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে শুরু হয় রক্তক্ষণ।
৩ ঘন্টা পর ৫ কিলোমিটারের কাঁচা পথ পেরিয়ে ভ্যানটি যখন উল্লাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাল, ততক্ষণে অন্তঃসত্তা আতিয়া আর পৃথিবীতে নেই। আতিয়ার বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের বেতকান্দি গ্রামে। কাঁচা সড়কের গল্প করতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন আতিয়ার পিতা আকবর আলী। কাঁচা সড়কের কারণে এক দশক আগে নিজের মেয়েকে সময় মতো হাসপাতালে নিতে পারেননি। সেই ক্ষত আর দুঃসহ স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়ান তিনি।
আকবর আলী বলেন, পাশ্ববর্তী ভাঙ্গুড়া উপজেলা সীমান্তের কাছে তাদের বাড়ি। সেখান থেকে সুবৈদ্যমরিচ, বাগমারা বাজার হয়ে উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়কে হাটু কাদা ছিল। কয়েকজন মিলে ভ্যান ঠেলেও মেয়েকে সময় মতো হাসপাতালে নিতে পারেননি। সেই আক্ষেপ তিনি ভুলবেন কি করে।
শুধু যে আকবার আলীর ক্ষেত্রেই এমন করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নয়। উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পশ্চিমের বাগমারা, বেতকান্দি, বগুড়া, সুবৈদ্যমরিচ, মন্ডমালা, গজাইল, দিঘল গ্রামসহ অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকুলতার শিকার হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, স্বাধীনতা পরবর্তী এই দীর্ঘ সময়েও উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পশ্চিমের গ্রামগুলোর সাথে উপজেলা সদরের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। অথচ ৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়কের মধ্যে রয়েছে দুইটি প্রাথমিক, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদরাসা, কলেজ ও দশ গ্রামের মানুষের একটি কবরস্থান। এছাড়া গ্রামের একটি বড় হাট রয়েছে। বাগমারার প্রাচীণ এই হাটেই নিজেদের প্রয়োজনীয় কেনাবেচা করেন পশ্চিমের ১০ গ্রামের মানুষ।
প্রবীণ খাদেম মিয়া বলেন, অন্তত ৮টি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছেনতিনি। ভোটের আগে নেতারা সড়ক পাকা করে দেওয়ার কথা বলে ভোট চেয়েছেন। নির্বাচত হওয়ার পর আর খোঁজ রাখেননি। এভাবে আশ্বাসেই কেটে গেছে কয়েক যুগ কিন্তু সড়ক পাকা হয়নি। বর্তমান সংসদ সদস্যের কাছে ৫ কিলোমিটারের কাঁচা সড়ক পাকা করণের দাবি তার।
আবুল হোসেন, সোনাই লাল, নিতাই চন্দ্র, করিম মোল্লাসহ আন্তত ৫০জন কৃষক বলেন, এসব এলাকার কৃষকেরা চাষাবাদের জন্য জমিতে সার-কীটনাশকের যোগান দিতে যেমন ভোগান্তি পোহাতে হয়। তেমনি উৎপাদিত কৃষি পন্য সময়মতো বাজারজাত করতে না পারায় ন্যাজ্য মূল্য বঞ্চিত হতে হয় এই এলাকার কৃষকদের। ৫ কিলোমিটারের কাঁচা সড়কটি পাকা হলে কৃষকদের দুর্ভোগ কমবে। মিলবে ফসলের ন্যাজ্য মূল্য।
বাগমারা স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, কত নেতা বাগমারা, বেতকান্দি, বগুড়া, সুবৈদ্যমরিচ, মন্ডমালা, গজাইল, দিঘল, মাতারবাড়ি গ্রামসহ উধুনিয়া ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ এটি। এই পথ ধরেই শিক্ষার্থীরা স্কুল কলেজে যাতায়াত করে। বর্ষায় কাদা আর শুষ্ক মওসুমে ধুলোয় ব্যপক ঝুঁকির মুখে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। অথচ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পাকাকরণ হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক পাকাকরণ করা হয়নি।
মানুষের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী শহিদুল্লাহ বলেন, ৫ কিলোমিটারের কাঁচা সড়কটি পাকা করণে ব্যবস্থা নেবেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, তিনি নতুন এসেছেন। বিষয়টি তার জানা নেই। এলাকাবাসী লিখিতভাবে আবেদন করলে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়কটি পাকাকরণের ব্যবস্থা নেবেন।